Searching...

Popular Posts

Tuesday, August 20, 2013

লোকসানি ব্যাংক বেসিকের ভরসা সরকারি আমানত

10:58 PM

রাষ্ট্র খাতের গর্ব করার মতো বেসিক ব্যাংক এখন একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বিশেষ আনুকূল্যে’ ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যাংকটিকে লাভজনক দেখানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা ২০১২ সালের নভেম্বর সময়ে বেসিক ব্যাংকের তিন শাখাতে অনুসন্ধান চালিয়ে যেসব অনিয়ম পেয়েছেন, সেগুলো বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

বেসিক ব্যাংকের সিংহভাগ আমানত জোগানকারী আবার সরকারের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এই ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি ভালো-মন্দ হওয়ার সঙ্গে সরকারের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বেসরকারি খাতকে ঋণ দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এসব ঋণের বড় অংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম। ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাই বেসিক ব্যাংকে আমানত রাখতে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক নির্দেশনাও দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তিনগর, গুলশান ও দিলকুশা শাখার গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ঋণ বিতরণে অনিয়মের জন্য সরাসরি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ঋণের অর্থ পরিশোধিত হবে না জেনেও ঋণ প্রদান করা হচ্ছে এবং ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের প্রেক্ষিতে পর্ষদ কর্তৃক আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।’ আবার আরেক ঋণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংকের ঋণশৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে মর্মে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ধরনের ঋণ পরিশোধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।’
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৬ ও ৪৭ ধারায় যেসব গুরুতর অভিযোগে কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ ও সরকার মালিকানাধীন ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করার বিধান রাখা হয়েছে, এগুলো সেই ধরনের গুরুতর অনিয়ম। কিন্তু রাজনৈতিক আনুকূল্য বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজটি করছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি ও জনগণের আমানত এখানে খেয়ানত করা হয়েছে। যার এক বিরাট অংশ ফেরত আসবে না। এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, আইন অনুসারে এমডিকে অপসারণ করা এবং পর্ষদ ভেঙে দিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা।’
লোকসানি প্রতিষ্ঠান: ২০১২ সালভিত্তিক বেসিক ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বহিঃনিরীক্ষকের (অডিটর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসিক ব্যাংকে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে ২৯৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখা হয়েছে। কিন্তু দুই নিরীক্ষকের (সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোং ও আজিজ হালিম খায়ের চৌধুরী) পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বিতরণ করা ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে আরও ১৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি থাকতে হবে। আর এটা করা হলে কর পরবর্তী নিট মুনাফা ১৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা কমে যাবে। ২০১২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যাংকের কর পরবর্তী নিট মুনাফা দেখানো আছে মাত্র দুই কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ফলে ২০১২ সালে কার্যত ব্যাংকের নিট লোকসান ১৩৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার কিছু বেশি।
আবার দুই কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার টাকার যে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে, তা-ও আবার ব্যাংকটির গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
নিরীক্ষকের প্রতিবেদন তথ্য অনুসারে, বেসিক ব্যাংক যে ১৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকার কম নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে, এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা সম্মতি আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অতিরিক্ত টাকার নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যাংককে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, বেসিক ব্যাংক কোনো নিট মুনাফা দেখাবে না—এ শর্তে ছয় মাসের ছাড় তারা দিয়েছিল।
জালিয়াতির ঋণ সমন্বয়ে আরও লোকসান: বাংলাদেশ দুই ভাবে ব্যাংকগুলোকে নজরদারি করে। ব্যাংকগুলো যে তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠায় সেগুলো থেকে তথ্য উদ্ঘাটন আর সরেজমিন পরিদর্শন। বেসিক ব্যাংকের দুই জায়গাতে সমস্যা পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল বেসিকের পরিচালনা পর্ষদের ১১টি সভা (গত ’১২ সালের এপ্রিল থেকে গত মার্চ) ধরে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের তথ্য প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আর তিনটি শাখাতে ২০১১ ও ’১২ সালের বিতরণ ও অনুমোদন করা ঋণ সরেজমিন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬৭টি হিসাবে দুই হাজার ৫৬৪ কোটি টাকার গুরুতর অনিয়ম পায়। এসব অনিয়ম বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সেগুলো ব্যাংক মানেনি। এ ঋণগুলোর বড় অংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম। অধিকাংশ ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ছিল ঋণটি আদায় বা খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা। এগুলো খেলাপি হলে লোকসান অনেক বাড়বে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনকাজও পুরোপুরি শেষ করা হয়নি। যেমন, কোনো ঋণের টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে যে হিসাবে জমা হচ্ছে সেই হিসাবটি ঋণ গ্রহণকারীর কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল সরেজমিন করেনি। দেখা গেছে, ভিন্ন কোনো ব্যাংকের হিসাবে টাকাটা জমা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর সুবিধাভোগী অন্য কেউ হতে পারে। কিন্তু, বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকে ভিন্ন ব্যাংকের হিসাব খতিয়ে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি। উপরন্তু, দু-এক দিন পরই পরিদর্শক দলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আবার এসব ঋণের অনেকগুলোর বাড়তি সময় বা গ্রেস পিরিয়ড আছে। দুই বছর পর কিস্তির অর্থ ফেরত আসার কথা। তখন বোঝা যাবে কী হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে আমানত: বেসিক বাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জুনভিত্তিক ব্যাংকের ১২ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকার আমানতের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৯৪০ কোটি টাকা সাধারণ গ্রাহকের আমানত। ২৯১ কোটি টাকা আন্তব্যাংক আমানত। প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা হচ্ছে সরাসরি সরকারের আমানত। কিন্তু ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত হচ্ছে সাত হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। বাকি ২৪০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে নেওয়া এফডিআর ও অন্যান্য দায়।
আবার ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অর্থই হচ্ছে সাত হাজার ৩১৪ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের অর্থ মাত্র ১০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরাসরি সরকারের আমানতও আছে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার নিজে ও সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৭৬ শতাংশ আমানতে বেসিক ব্যাংক চলছে।
যোগাযোগ করা হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকটির পরিস্থিতি ভালো করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সরকারের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে সর্বতোভাবে সহায়তা করছি। যাতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিছুটা উন্নতিও হয়েছে।’ তিনি বলেন, অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে, এখন সংশোধন করা হচ্ছে।
তবে জানা গেছে, এসব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বেসিক ব্যাংকের পাঠানো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম উদ্ঘাটন পরবর্তী সময়ে ঋণ খেলাপি করার নির্দেশ সমন্বয় করা হলে এ পরিস্থিতি থাকবে না মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), সেতু কর্তৃপক্ষ, বেপজা, ন্যাশনাল হাউজিং, তিতাস গ্যাস, ডেসকো, বেসামরিক বিমান চলাচল, ওয়াসা, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, জীবন বীমা করপোরেশন, রাজউক, বিএডিসি, রাকাব, আরইবি, পিকেএসএফ, যমুনা সার কারখানাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংকে বড় আমানত রেখেছে বা রাখছে।
যোগাযোগ করা হলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বলেন, ব্যাংকটিতে তাঁদের আমানত এখন কমিয়ে ৫০০-৬০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের একজন কর্মকর্তাও জানান, তাঁদের আমানত বেশি ছিল, স্থায়ী আমানতের মেয়াদ পূর্তির পর নতুন করে নবায়ন করা হয়নি। এখন ২০০ কোটি টাকার মতো আমানত আছে।
সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ব্যাংকে রাখার ক্ষেত্রে একটা অনুপাত আছে। ৭৫ ভাগ আমানত রাখতে হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকে। এত দিন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালীর চেয়ে বেসিক ব্যাংক ভালো ছিল বলে এখানেই বেশি আমানত রাখা হতো। কিন্তু এখন এই ব্যাংকটিই বড় সংকটে।
বক্তব্য নিতে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি ফোনে যোগাযোগ করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

0 comments:

Post a Comment