নিহতের স্বজনেরা জানান, রমজানের আগ থেকেই মেয়ে ঐশির উচ্ছৃঙ্খলতাকে
কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না বাবা-মা দু’জনেই। এ কারণে বাসার
দারোয়ানদের মেয়েকে একা যেতে দেখলে তাকে যেতে নিষেধ করার আদেশও দিয়েছিলেন
তারা। কিন্তু সেই মেয়েই কাল হলো দু’জনেরই।
পুলিশেরও ধারণা, মেয়ে ঐশির সূক্ষ্ম পরিকল্পনাতেই হত্যার শিকার হন এই
দম্পতি। বাবা-মা খুন হয়ে যাওয়ার পরও একমাত্র মেয়ে আত্মগোপনে থাকায় এ সন্দেহ
আরো জোরালো হচ্ছে। তার সঙ্গে পলাতক রয়েছে বাসার গৃহকর্মী সুমিও।
এ ঘটনায় ঐশি জড়িত মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই তদন্তে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা ও
স্বজনেরা বলছেন, বাবা-মা হত্যার পর স্বাভাবিক আচরণ করে সবার চোখে ধুলো দিয়ে
উধাও হয়ে যায় সে। ঐশিকে আটক করতে পারলে পুরো খুনের রহস্য বের হয়ে আসবে
বলেও মনে করছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
রাজধানীর ২ নম্বর চামেলীবাগের চামেলী ম্যানশনের ৫মতলার ৫/ডি নম্বর
ফ্ল্যাটের ভাড়া বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ইন্সপেক্টর
মাহফুজুল হক ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয় শুক্রবার
সন্ধ্যায়। পল্টন থানা পুলিশ খবর পেয়ে তাদের লাশ উদ্ধার করে। ধারণা করা
হচ্ছে, ২-৩দিন আগে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
এ জোড়া খুনের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত বাসার ২ দারোয়ান শাহিনুর ও আব্দুল মোতলেবকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার
স্ত্রী স্বপ্না রহমানের দু’সন্তান। মেয়ে ঐশি রহমান (১৬) ও ছেলে ওহি রহমান
(৭)। ঐশি রহমান ধানমণ্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ও-লেভেলের
শিক্ষার্থী। আর ওহি রহমান রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর
ছাত্র।
পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঐশি রহমান সম্প্রতি বেশ
উচ্ছৃঙ্খল ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল। কাজ না থাকলেও সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে
কখনো রাত সাড়ে ১০টা, কখনো রাত ১১টা আবার কখনো গভীর রাতে বাড়ি ফিরতো। যার
কারণে তাকে নিয়ে বাবা-মা দু’জনেই খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। আর ঐশির এমন
চলাফেরায় উদ্বিগ্ন বাবা-মা তার বিষয়ে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও আলোচনা করতেন।
কিভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ নিতেন। স্বজনদের
পরামর্শ নিয়েই রমজান মাসের শুরু থেকে ঐশির চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা হয়।
এমনকি সে যেন একা একা বাড়ি থেকে বের হতে না পারে বিষয়টি বাড়ির দারোয়ানদের
বলে দেওয়া হয়েছিল।
এরপর থেকেই মূলত ঐশির সঙ্গে বাবা-মার বিরোধ সৃষ্টি হয়। আর এ বিরোধ থেকেই
মেয়ে তার বাবা-মাকে হত্যার পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করে বলে ধারণা করছেন
শোকাহত স্বজনেরাও।
মেয়ের সঙ্গে বাবা-মার বিরোধকে কেন্দ্র করেই যে এই চাঞ্চল্যকর জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও তা পরিস্কার।
ওহির সঙ্গে কথা বলার বরাত দিয়ে পুলিশের কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যরা
বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে ঘুম থেকে ওহি উঠে দেখে, তার বাবা মা বাসায় নেই।
বাবা-মার রুম ও ঐশির রুম তালা দেওয়া। আর বড় বোন ঐশি এ অবস্থায় তাকে বাইরে
যাওয়ার জন্য বলে। ঐশি ওহিকে বলে, বাবা-মা খালামনির বাসায় আছেন। আমরা সেখানে
যাবো। এরপর ঐশি ৫ তলা থেকে বাসার নিচে নামলে দারোয়ানরা তাকে একা যেতে দিতে
নিষেধ করেন। এ সময় ঐশি বাসার ওপরে উঠে ইন্টারকমে ফোন করে মায়ের মত কণ্ঠ
করে দারোয়ানদের যেতে দিতে বলে। এ সময় দারোয়ানরা তাকে যেতে দেন।
এরপর খালার বাসায় না গিয়ে ঐশি কাকরাইলে তার বান্ধবী তৃষার বাসায় যায়। এ
সময় স্বজনদের ফোন করে ঐশি জানায়, তার বাবা-মা রাজশাহীতে বেড়াতে গেছেন। এরপর
বাবার ফোনটি বন্ধ রেখে মায়ের ফোন চালু রাখে। ঐশির সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই
স্বজনদের মনে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার এভাবেই সারাদিন কেটে গেলেও শুক্রবার থেকে সন্দেহ আরো দানা
বেঁধে ওঠে। এক পর্যায়ে শুক্রবার সকালে নিহত মাহফুজুর রহমানের ভায়রা ভাই
ঐশির খালু রবিউল ইসলাম ঐশিকে ফোন করে বাসায় আসতে বলেন। এ সময় ঐশি তার ছোট
ভাই ওহিকে কাকরাইল মোড়ে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে নিজে উধাও হয়ে যায়। পরে রবিউল
ওহিকে একা বাসায় ফিরতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ওই বাসায় গিয়ে দরজা
বন্ধ দেখে তালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। বাসার ভেতরের ঐশির রুমের বাথরুমে
গিয়ে কাপড় দিয়ে জড়ানো পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না
রহমানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঐশির খালু ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, এ খুনের সঙ্গে ঐশির জড়িত থাকার
ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত। খুন বুধবার রাতে হলেও ঐশির গত দু’দিনের
স্বাভাবিক আচরণে আমরা তা নিশ্চিত হয়েছি। যদি সে জড়িত না থাকতো, তাহলে ঘটনার
দিনই সবাইকে জানাতো। এমনকি সেও আহত হতে পারতো। তাছাড়া সে পলাতক থাকতো না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্প্রতি ঐশি খুবই উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করছিল।
মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মেহেদি হাসান সাংবাদিকদের বলেন,
খুনের যে আলামত, তাতে মনে হচ্ছে, এ জোড়া খুনের ঘটনার সঙ্গে ৫/৬ জন জড়িত।
তারা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ছুরিকাঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেই বাড়ি থেকে
বের হয়ে যায়। আর নিহতদের মেয়ে ঐশির যা আচরণ তাতে সে যে খুনের সঙ্গে জড়িত
আমরাও সেটা নিশ্চিত। তবে কারা কারা খুনের সঙ্গে জড়িত এবং কি কারণে সেটি
ঐশিকে আটক করতে পারলেই তা পরিস্কার হওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, তবে মর্মান্তিক ও রোমহর্ষক এ ঘটনার পর মেয়ে ঐশির
স্বাভাবিক আচরণ আমাদের নিকট বিস্ময় লেগেছে। কারণ, বাবা-মাকে খুন হওয়া দেখলে
কোনো সন্তানেরই স্বাভাবিক আচরণ থাকার কথা নয়। সে জায়গায় ঐশির এমন আচরণ
বিস্ময় জাগায়।
চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক এ পুলিশ কর্মকর্তা দম্পতির খুনের ঘটনার তদন্ত
করছে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, ডিবি পুলিশ এবং এসবি। এই ৩ সংস্থার পক্ষ
থেকেই এ জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছেন কর্মকর্তারা। তারা সবাই এখন
নিহতের মেয়ে ঐশি রহমান ও গৃহকর্মী সুমিকে খুঁজছেন। এছাড়া আটক বাসার ২
দারোয়ান শাহিনুর রহমান ও আব্দুল মোতালেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তারা। ঘটনার
আগে-পরে ওই বাসায় কারা কারা এসেছিলেন সে তথ্য পেতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে
তাদের।
এদিকে ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার আগে আটক দারোয়ান মোতালেবও সাংবাদিকদের
জানিয়েছেন, রমজান মাস থেকে ঐশির মায়ের আদেশ ছিলো, ঐশি যখন গেট দিয়ে বাসার
বাইরে যাবে, তখন তার মায়ের অনুমতি লাগবে। তবে ঐশি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে
৮টায় বাসা থেকে বের হবার সময় তিনি (মোতালেব) ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে বের হয়ে
সিএনজিতে ওঠার সময় তিনি ঐশিকে দেখে বলেন, ‘আপনার মায়ের অনুমতি লাগবে’। এ
কথা বলার পর ঐশি তাকে ফোন করার কথা বলে ওপরে ওঠে। পরে ঐশিই ফোন ধরে মোটা
গলায় তার মায়ের কণ্ঠ নকল করে বলে, ‘ওকে যেতে দিন। ঐশি ওর খালার বাসায় যাবে।
ঐশির খালার বাসা উত্তরায়’।
দারোয়ানের এ কথা থেকেও পুলিশ ঐশিকে সন্দেহ করছে। হয়তো খুব ঠাণ্ডা মাথায়
ভাড়াটে খুনি দিয়ে সেই কাজটি করে ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যায় বলে ধারণা পুলিশের।
0 comments:
Post a Comment