Searching...

Popular Posts

Saturday, August 3, 2013

বিনিয়োগে ধস : আমদানি ও কর্মসংস্থানে ঘাটতি : প্রকল্প কমেছে ২৬ শতাংশ, কর্মসংস্থান কমেছে ৩৯ শতাংশ

3:32 AM
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস-বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোর অভাবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুবই নাজুক। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ গত ক’বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। সরকারের বিনিয়োগ বোর্ডের খাতা-কলমে টাকার অঙ্কে বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বিনিয়োগের প্রকল্প ২৬ শতাংশ এবং প্রকল্পগুলোর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ৩৯ শতাংশ কমেছে। এদিকে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের কতটুকু প্রকৃত বিনিয়োগ হয়েছে—তার কোনো হিসাব নেই বিনিয়োগ বোর্ডেই। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বেসরকারি বিনিয়োগে ধস, আমদানি কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে ঘাটতি—এসবই প্রমাণ করে প্রকৃত বিনিয়োগ অনেক কমে গেছে। যদি প্রকৃত বিনিয়োগ কমে যায়, তবে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ বোর্ড থেকে গত ৫ বছরের প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরের মোট প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ১৭৫৮টি। কিন্তু ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা ১৩০৭টি। হিসাবে ৫ বছরের ব্যবধানে প্রকল্প কমেছে ৪৫১টি। শতকরা হিসাবে বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২৫.৬৫ শতাংশ। এছাড়া ২০০৭-০৮ অর্থবছরের বিনিয়োগের ফলে প্রস্তাবিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪৪টি। অথচ ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত কর্মসংস্থানের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ৪৮৩টি। ৫ বছরের ব্যবধানে কর্মসংস্থান কমেছে ৩৯.০১ শতাংশ অর্থাত্ ১ লাখ ৬০ হাজার ২৬১টি। অথচ ৫ বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ ২৪৭৮৫৮.৯২২ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ৫৩৩২৫০.২০০ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। টাকার অঙ্কে বিনিয়োগ বেড়েছে ১১৫.১৪ শতাংশ অর্থাত্ ২৮৫৩৯১.২৭৮ মিলিয়ন টাকা। বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের যে নীতিগত তত্ত্ব অর্থনীতিতে রয়েছে, তার উল্টো পথে চলেছে বাংলাদেশ। সাধারণত স্বল্পোন্নত দেশে আয় কম থাকে বলে জাতীয় সঞ্চয়ও কম থাকে এবং বিনিয়োগ করার মতো অর্থ থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় সঞ্চয় বেশি অথচ বিনিয়োগ কম। বর্তমানে সঞ্চয়ের হার ২৯.৪ শতাংশ আর বিনিয়োগের হার ২৫.৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, বিনিয়োগ করার জায়গা বা পরিবেশ না থাকায় বাংলাদেশের মানুষ বিনিয়োগবিমুখ হয়ে সে সম্পদ বসিয়ে রাখছে। যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভও অনেক বেড়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় বিনিয়োগের হার ৩০.৬ শতাংশ, সঞ্চয়ের হার ২৪ শতাংশ; ভারতে বিনিয়োগ ৩৫.১ শতাংশ, সঞ্চয় ৩২.৩ শতাংশ। পৃথিবীর সব দেশেই বিনিয়োগ বেশি, সঞ্চয় কম। শুধু উল্টো পথে বাংলাদেশ।
প্রকৃত বিনিয়োগ যে কমে গেছে—তার দৃষ্টান্ত হলো বেসরকারি বিনিয়োগের চরম দুরবস্থা। বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর এখন তা কমে হয়েছে ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের হার এটাই সর্বনিম্ন। বিদ্যুত্, গ্যাস, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সঙ্কটের কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। আবার রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘর্ষ, হরতাল—এসব কারণেও ধীরে চলো নীতি বজায় রাখছেন তারা। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণও নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৭ শতাংশ। যদিও দ্বিগুনেরও বেশি ঋণ দেয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ সরবরাহে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। ঋণ নেয়ার হার কম হওয়ার অর্থ হচ্ছে বড় প্রকল্প কেউ হাতে নিচ্ছেন না, ব্যবসা-বাণিজ্যে কেউ বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন না। সেজন্য কারও অর্থেরও প্রয়োজন পড়ছে না; ফলে কেউ ঋণও নিচ্ছে না।
প্রকৃত বিনিয়োগ যে অনেক কম—তার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো আমদানিতে ধস। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। অর্থাত্ আগের অর্থবছরের তুলনায় তা কমেছে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর আগে বাংলাদেশে আমদানি ব্যয়ে সর্বশেষ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০০১-০২ অর্থবছরে, সাড়ে ৮ শতাংশ।
উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন না বলেই যে আমদানি হ্রাস পেয়েছে, তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির পরিমাণও কমেছে। মার্চ পর্যন্ত সময়ে পুঁজি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও নিষ্পত্তি কমে গেছে। মূলত বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতেই পুঁজি যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে, অন্য খাতে নয়। সবচেয়ে বেশি কমছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি। এক্ষেত্রে নতুন ঋণপত্র খোলাও কমে গেছে।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকৃত অর্থে যে বিনিয়োগ হচ্ছে না—তার আরও একটি দৃষ্টান্ত কর্মসংস্থানের ঘাটতি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) হিসাব দিয়ে বলছে, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশে গড় বিনিয়োগের হার ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। আর এর আগের পাঁচ বছরে বিনিয়োগ হয়েছিল গড়ে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাত্ গড় বিনিয়োগ বেড়েছে অতি সামান্য। সংস্থাটির হিসাবে এ সরকারের আমলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বিনিয়োগ কম হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকও মনে করে, বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের তুলনায় বিনিয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বিনিয়োগ স্থবিরতার শিকার হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। বিনিয়োগ না বাড়লেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তাই শিল্পখাতে কর্মসংস্থানও তেমন বাড়েনি। এতে গত চারটি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করা যায়নি।
শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে শ্রমশক্তির পরিমাণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ। এর মধ্যে ৫ কোটি ৪১ লাখ মানুষের কাজ আছে। এর অর্থ মাত্র ২৬ লাখ মানুষ বেকার। তবে এ পরিসংখ্যানে কৌশল রয়েছে। কারণ জরিপেই বলা আছে যে, পরিবারের মধ্যে কাজ করেন কিন্তু কোনো মজুরি পান না—এমন মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১১ লাখ। এছাড়া আছেন আরও এক কোটি ছয় লাখ দিনমজুর। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এর ওপর এখন প্রতিবছর নতুন করে ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছেন। সুতরাং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির চাপ রয়েছে অর্থনীতির ওপর। আর এজন্য নতুন বিনিয়োগের বিকল্প নেই। অথচ বিনিয়োগই বাড়ানো যাচ্ছে না।
এফডিআই বেড়েছে কিন্তু স্থানীয় বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে বলে স্বীকার করেছেন বিনিয়োগ বোর্ডের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, সরকারের শেষ বছরের নানা কারণে স্থানীয় বিনিয়োগ কিছু কমতেই পারে। বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা এর জন্য দায়ী। কর্মকর্তারা আরও বলেন, পুঁজিঘন শিল্প প্রতিষ্ঠার কারণে প্রকল্পের সংখ্যা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমেছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ কারখানা প্রতিষ্ঠায় ব্যয় অনেক। সেখানে অটোমেটিক পদ্ধতিতে কাজ হয় বলে শ্রমিক কম লাগে; ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমেছে। আর শিল্প প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত পুঁজিঘন হওয়ায় প্রকল্পের পরিমাণ কমেছে। আগে যেখানে ২০-৩০ লাখ টাকায় একটি প্রকল্প হতো, এখন একেকটি প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। তাই পুঁজিঘন হওয়ার কারণেই প্রকল্প সংখ্যা কমেছে কিন্তু খরচ বেড়েছে।
এদিকে দেশে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বিপরীতে প্রকৃত অর্থে কি পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে—তার কোনো হিসাব নেই স্বয়ং বিনিয়োগ বোর্ডে। এ বিষয়ে তথ্য কর্মকর্তা জানালেন, প্রকৃত বিনিয়োগের হিসাব সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জটিল। কারণ কেউ ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব দিলেও তিনি একবারে ওই পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেন না, বিভিন্ন বছরে বিনিয়োগ করে থাকেন। তাই প্রস্তাবিত বিনিয়োগের কি পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে, তার হিসাব সংরক্ষণ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য।
এ বিষয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল বলেন, প্রস্তাবিত স্থানীয় বিনিয়োগের প্রকৃতপক্ষে কতটুকু বিনিয়োগ হয়েছে, তার হিসাব নেই। তবে বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) হিসাব রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিনিয়োগ বোর্ডের উচ্চপদস্থ আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই প্রস্তাবিত বিনিয়োগের কতটুকু প্রতি বছর বিনিয়োগ হচ্ছে—তা বের করা বেশ কষ্টকর। তবে প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ কতটুকু, তা বের করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিবিএস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই তা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে এর আগে প্রকৃত বিনিয়োগ সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই বলে তিনি জানান।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের সত্যিকার বিনিয়োগ কতটুকু—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা এরই মধ্যে যেসব তথ্য পেয়েছি, তাতে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অনেক অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী না জেনে বা না বুঝে বিনিয়োগ হচ্ছে না বলে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করেন এবং করছেন। সরকারকে অপছন্দ করে বলেই তারা সমালোচনার খাতিরে এসব মন্তব্য করেন

0 comments:

Post a Comment