১০০ দিন আগের সাভার বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গে গতকাল শুক্রবারের চিত্র
কোনোভাবেই মেলানো যাবে না। ২৪ এপ্রিল অনেক পথ হেঁটে যেতে হয়েছিল।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, উদ্ধারকাজে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবং
উদ্ধার তৎ পরতা মিলিয়ে গভীর উৎ কণ্ঠা আর থমথমে ও ভয়ংকর এক চিত্র ছিল
সেদিন।আর গতকালের চিত্র অন্য রকম। সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশেই রানা প্লাজা
ধসের সেই জায়গাটি কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, সেখানে এখনো কান্নার রোল। অথচ
আশপাশের বড় বড় বিপণিকেন্দ্রে ঈদের কেনাকাটার ধুম পড়েছে। কাঁটাতারে ঘেরা
জায়গাটি হয়তো অনেকের চোখেই পড়ছে না। রানা প্লাজা ধসের ঠিক ১০০ দিন পর
সেখানে গিয়ে মনে হলো, তাহলে কি মানুষের স্মৃতিতে রানা প্লাজা খানিকটা ফিকে
হয়ে এসেছে?শিল্পকারখানার ভবনধসের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ঘটনার
পর ১০০ দিন পার হলেও এর রেশ কিন্তু এখনো কাটেনি। আহত, নিহত ও নিখোঁজের
সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। এসব পরিবারের দুঃখকষ্টের শেষ নেই। এখনো
ক্ষতিপূরণ পাননি অনেকেই। কিছু শ্রমিকের ভুল চিকিৎ সা হয়েছে। অনেকে
আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যুর কারণে
অনেক পরিবারের পথচলা থমকে গেছে। জীবনযাত্রার মানও কমে যাচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা
জায়গাটিতে দাঁড়াতেই অনেকগুলো অনিশ্চিত মানুষের মুখের দেখা মিলল। আলম
মাতবর মনে করেছিলেন, হয়তো আমি সরকারের বা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কেউ।
তিনি আমার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর স্ত্রী বিউটি বেগমের একটা
ছবি। নিচে লেখা, ‘সন্ধান চাই মৃত্যু বা জীবিত’। কোনো এক কম্পিউটারের দোকান
থেকে ছবিসহ এই কাগজ তিনি তৈরি করে ফটোকপি করিয়ে নিয়েছেন। তাঁর এখন কাজ
হচ্ছে, প্রতিদিন এখানে এসে কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।আলম মাতবরকে কাগজ
দিতে দেখে চারপাশে ঘিরে দাঁড়ালেন আরও ২০-২৫ জন। সবার হাতে একই ধরনের কাগজ।
ভিড় বাড়তে লাগল। সংবাদকর্মীর পরিচয় দিলে ভিড় তো কমলই না, বরং বাড়ল।
তাঁদের অভিযোগের শেষ নেই। এঁদের বেশির ভাগই আহত পোশাকশ্রমিকের বাবা বা
স্বামী। আহতরাও কেউ কেউ আছেন। সবার একটাই কথা, ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না।
বিকাশের মাধ্যমে সরকারি টাকা অনেকে পেলেও এখন টাকা দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
তাঁদের অভিযোগ, বিজিএমইএ অফিসে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি। কার কাছে যেতে হবে
এটাই কেউ জানেন না।
ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার এই চিত্রের প্রমাণ মেলে পরিসংখ্যান
থেকেও। বিজিএমইএ এখন পর্যন্ত বেতন দিয়েছে দুই হাজার ৭৫৯ জন শ্রমিককে। অথচ
বিজিএমইএর হিসাবে কারখানাগুলোতে মোট শ্রমিক ছিলেন তিন হাজার ৫৫৩ জন। মৃতদের
মধ্যে চিহ্নিত করা যায়নি ২৯১ জনকে। যাঁদের চিহ্নিত করা যায়নি তাঁদের
বেতন পরিশোধ করা হয়নি। এই হিসাবে এখনো ৫০৩ জন শ্রমিক ক্ষতিপূরণ তো দূরের
কথা, প্রাপ্য বেতনও পাননি।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির
(বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, ‘নীতিনির্ধারকদের
পক্ষ থেকে অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা মাঠপর্যায়ে বা
কারখানা-পর্যায়ে যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন। তবে এটি
দান। আমরা বলছি, এ ঘটনার দায় নিতে হবে। যারা দায়ী, তাদের কাছ থেকে অর্থ
আদায় করে দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা এ লক্ষ্যে কাজ
করছি। আমরা চাই, পোশাকের ক্রেতা, কারখানার মালিক ও বিজিএমইএ দায় নিয়ে
ক্ষতিপূরণ দেবে।’
২৪ এপ্রিলের ওই ঘটনায় নিহত হন এক হাজার ১৩২ জন শ্রমিক।
দেশের ইতিহাসে এটাই মানবসৃষ্ট সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এ ঘটনায় শুধু
বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়েছে। বিশ্বের সব গণমাধ্যমে এ ঘটনা
ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাককর্মীদের অবস্থাকে ‘ক্রীতদাসের’
সঙ্গে তুলনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মগুরু
পোপ ফ্রান্সিস।
বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও হুমকির মুখে সরকার সব
ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থে আইন সংশোধন
এবং কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নত করতে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি দেয়। কারখানা
তদারকির জন্য লোকবল নিয়োগসহ নানা ধরনের পদক্ষেপের কথাও বলা হয়। কিন্তু
১০০ দিন পর দেখা যাচ্ছে, এখনো অনেক কিছু প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
রয়েছে সমন্বয়হীনতা। এমনকি মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ শুরুতে নানা তৎ পরতা
দেখালেও এখন অনেকটাই স্তিমিত। বাস্তবায়নের তাগিদেও ভাটা পড়েছে। সব মালিক
অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসেননি। অনেক কিছুই হয়েছে লোক দেখানো।
চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক
রপ্তানিকারক দেশ। প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার রপ্তানি আয় আসে এই খাত থেকে,
যা মোট রপ্তানি আয়ের ৭৮ শতাংশ। ৩৫ লাখ শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন, যাঁদের ৭০
শতাংশই নারী। মোট দেশজ উৎ পাদনে (জিডিপি) পোশাক খাতের অংশ ১৩ শতাংশ। অথচ
এই পোশাকশ্রমিকেরা কাজ করেন অনিরাপদ এক কারখানায়, কারখানার ভবনগুলো
সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয় না, কারখানার নিরাপত্তা তদারকি ঠিকমতো হয় না,
শ্রমিকদের সংগঠিত হতে দেওয়া হয় না, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেতন
দেওয়া হয় সবচেয়ে কম। অথচ পোশাক খাতের মালিকেরা এখন বাংলাদেশের ধনিক
গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য।
রানা প্লাজার মালিক এবং ওই ভবনে থাকা পোশাক কারখানাগুলোর
মালিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা হয়েছে চারটি। মামলাগুলোর তদন্ত ১০০
দিনেও শেষ হয়নি। ছবি তুলতে গিয়ে আমাদের ফটোসাংবাদিক দেখা পেয়েছিলেন নিহত
পোশাকশ্রমিক ফজলে রাব্বীর মা রাহেলা খানমের। তিনি প্রতিদিন আসেন সাভারে
রানা প্লাজার সামনে। তিনি ক্ষতিপূরণ চান না। রাহেলা খাতুনের একটাই
চাওয়া—তিনি রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে সামনে দেখতে চান। তাঁকে বলতে
চান, ‘কেন আমার ছেলেটাকে ডেকে এনে মেরে ফেললেন।’ গতকালও সাভারে কাঁটাতারের
বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে বিচার চাইলেন নিখোঁজ সাগরিকার বাবা নাটোরের মো.
ইব্রাহীম শাহ।
প্রখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন গত ২২ জুলাই একটি বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ করে বলেছে, রানা প্লাজা ধস স্থানীয় পর্যায়ের দুর্ঘটনা হলেও সারা
বিশ্ব ব্যাপকভাবে এর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের পোশাক
কারখানা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। কারণ, এর ছয় মাস
আগেই তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড নামের আরেকটি কারখানায় আগুন লেগে মারা যান
১১২ জন শ্রমিক।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান
আর্থিক সহায়তাসহ পোশাক কারখানার নিরাপত্তা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ
নিয়েছে। বিশ্বে এর আগে কোনো শিল্প দুর্ঘটনার পর এ রকম প্রতিক্রিয়া দেখা
যায়নি।
রানা প্লাজা ধসের কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের ক্রেতারা বাংলাদেশে বানানো পোশাক কিনতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।
অনেক ক্রেতা বিক্ষোভ করেছেন। এতে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাজারে পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার সুবিধা বা
জিএসপি স্থগিত করে বলেছে, রানা প্লাজার ঘটনা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণকে
ত্বরান্বিত করেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের গতকাল প্রথম আলোকে
বলেন, সরকারসহ ক্রেতারাও অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের কাছে অনেক কিছু জানতে চাইছে। কিছু কিছু বিষয়ে হয়তো দ্রুত কিছু
করা যাচ্ছে না। তার পরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সবার সঙ্গে সমন্বয় করার
চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চাপের মুখে বাংলাদেশ এখন অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি
দিয়েছে। দ্রুততার সঙ্গে শ্রম আইন সংশোধন করেছে। সরকারের চারটি সংস্থা
তদন্ত করেছে। আদালতে একাধিক রিট হয়েছে। প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার করা
হয়েছে ভবন ও পোশাকমালিকদের। যদিও অতীতে দেখা গেছে, বড় কোনো ঘটনার পর
সরকার ও বিজিএমইএ অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলো পরে আর দেখা
যায় না। তবে রানা প্লাজার হতাহতের ঘটনা এতটাই ব্যাপক যে, সারা বিশ্বের চোখ
দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ওপরই থাকবে। দেশের মধ্যেও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর
পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দেশের কিছু প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রতিশ্রুত
পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
সিপিডির চেয়ারম্যান প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রথম আলোকে
বলেন, ‘এত বড় একটি ঘটনার ক্ষেত্রে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে, সবারই
দায়িত্ব রয়েছে। সুশীল সমাজেরও অনেক কিছু করার আছে। অনেক ধরনের পদক্ষেপ
নেওয়া হচ্ছে। আমাদের কাজটি হচ্ছে এসব পদক্ষেপ তদারক করা এবং এর স্বচ্ছতা
যাতে থাকে সেটি নজরে রাখা।’
কেবল বাংলাদেশ নয়, এ ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা বড়
বড় খুচরা বিক্রেতাও চাপের মধ্যে পড়েছে। এতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার
নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের মান বাড়াতে তারাও উদ্যোগ নিয়েছে। খুচরা পোশাক
বিক্রেতারা তহবিল গঠন করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন একটি চুক্তি নিয়ে
হাজির হয়েছে। বড় অঙ্কের তহবিল গঠনের উদ্যোগও নিয়েছে বড় বিক্রেতারা।
সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা: বিশ্বে এখন
পর্যন্ত ভবনধসের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধসে দুই
হাজার ৭৫২ জনের মৃত্যু। তবে এটি ছিল নাশকতামূলক ঘটনা। নির্মাণে ত্রুটি ও
অবহেলার কারণে বিশ্বে ভবনধসের সবচেয়ে বড় ঘটনা সাভারে রানা প্লাজা ধস। আর
দ্বিতীয় বড় ঘটনাটি ছিল ১৯১১ সালের। ওই বছরের ২৫ মার্চ নিউইয়র্কের পোশাক
কারখানা দি ট্রায়াঙ্গাল শার্টওয়েস্ট ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে ১৪৬ জন শ্রমিক
মারা যান। এর বাইরে ইউক্রেনের চেরনোবিল নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট (৩১ জন
নিহত) ও ভারতের ভুপাল গ্যাসক্ষেত্রে (৩৭৮৭ জন নিহত) দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
টাইম ম্যাগাজিন একটি প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে,
‘রানা প্লাজার পোশাক কারখানাগুলোতে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের শ্রম অন্যের
সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। অথচ তাঁরা এসব শ্রমিকের ঝুঁকি কমাতে
পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি।’ ১০০ দিন পার হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
বলছেন না যে, কারখানার কর্মপরিবেশের বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে, শ্রমিকদের
ঝুঁকি কমেছে। রানা প্লাজার ঘটনাকে আর কেউ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছে না।
পোশাকমালিকেরা বলছেন, এ রকম আরেকটি ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের টিকে
থাকা সম্ভব হবে না।
শেষ প্রশ্ন হচ্ছে, সব উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনই করা হবে, নাকি আরেকটি ঘটনার জন্য অপেক্ষা?
0 comments:
Post a Comment