পুলিশ আর পিকেটারদের কড়া অবস্থানে সারাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা
হরতাল চলছে। হরতালে ঈদ ফেরত মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। দূরপাল্লার কোনো গাড়ি
চলছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বোমাবাজি, ভাংচুর ও
পুলিশ-পিকেটার সংঘর্ষ হয়েছে। মালবাহী ট্রাক ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে
পিকেটাররা। মেহেরপুর, বগুড়া, সাতক্ষীরা, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেটে
পুলিশের সঙ্গে পিকেটারদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলি আর সংঘর্ষে ৬ জন পুলিশ
সদস্যসহ শতাধিক পিকেটার আহত হয়। এদিকে হরতালের সময়সীমা ১২ ঘণ্টা কমানো
হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা
রফিকুল ইসলাম খান। ফলে আজ সন্ধ্যা ৬টায় হরতাল শেষ হবে।
অস্তিত্ব রক্ষার এ হরতালে জামায়াত ইসলামী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ-র্যাবও রাজপথ দখলে রেখেছে। র্যাব-পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলের ক্যাডাররাও রাজপথে রয়েছে। তারা বিভিন্ন স্থানে মহড়া দেয় এবং হরতালবিরোধী মিছিল করে। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া টহল হরতালে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কিছুক্ষণ পরপর জলকামান ও রায়ট কার নিয়ে পুলিশ এবং র্যাবের বিভিন্ন টিম বিভিন্ন পয়েন্টে হুইসল বাজিয়ে টহল দেয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে। কল্যাণপুর, যাত্রাবাড়ি, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে জামায়াত ও শিবির কর্মীরা। রাজধানীতে কিছু আন্তঃনগর বাস চললেও সংখ্যায় ছিল অন্য হরতালের চেয়ে অনেক কম। সরকারি অফিস খোলা থাকলেও উপস্থিতি ছিল খুবই কম। স্কুল-কলেজে ঈদের ছুটি এখনও শেষ হয়নি।
নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায় এবং জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার সরকারি পরিকল্পনার প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী ৩৬ ঘণ্টার হরতাল পালন করছে। প্রথমে ১২ ও ১৩ আগস্ট এ হরতালের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে ঈদ শেষে নির্বিঘ্নে যাত্রীদের ঢাকায় ফেরার কথা চিন্তা করে হরতাল একদিন পিছিয়ে ১৩ ও ১৪ আগস্ট করে দলটি। গতকাল এক বিবৃতিতে ৩৬ ঘণ্টার
এ হরতালের প্রথম দিন সফলভাবে জনগণ পালন করেছে বলে দাবি করেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। পুরো ৩৬ ঘণ্টার হরতাল সফল করতে দেশবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
হরতালের সমর্থনে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা। রাজধানীর কল্যাণপুরে সকাল পৌনে সাতটার দিকে ১০-১৫ জন শিবির-সমর্থক একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় তারা পাঁচটির মতো ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে তিনটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। গুলশানের শাহজাদপুরে ঝটিকা মিছিল ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় শিবির কর্মীরা।
সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সায়েদাবাদ ব্রিজ সংলগ্ন ইসলামিয়া জেনারেল হাসপাতালের সামনে ঝটিকা মিছিল করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রশিবির কর্মীরা। মিছিলটি সামনের দিকে এগিয়ে গেলে পুলিশ টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একই সময়ে লক্ষ্মীবাজার এলাকায় মিছিল করে কবি নজরুল সরকারি কলেজ শিবির কর্মীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন কলেজ শাখা শিবিরের সভাপতি সাইফুল ইসলাম শিহাব। এ সময় পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
সকাল পৌনে ৭টার দিকে কল্যাণপুর সোহরাব পেট্রোল পাম্পের সামনে থেকে মিছিল বের করে ছাত্রশিবির মহানগর (পশ্চিম) শাখার কর্মীরা। এ সময় তারা ৫-৬টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এছাড়া তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে দুই পথচারীসহ শিবিরের ঢাকা মহানগর পশ্চিমের সাংগঠনিক সম্পাদক মাঈন উদ্দিন ও অর্থ সম্পাদক বিপ্লব আহত হয়। তবে ঘটনাস্থল থেকে কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
সকাল ৭টার দিকে গুলশানের শাহজাদপুরেও ঝটিকা মিছিল ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। পরে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেলসহ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে ইসমাইল হোসেন বাবু নামে এক ফটোসাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়। শিবির সন্দেহে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সকাল ৮টার দিকে গেন্ডারিয়া ধুপখোলা মাঠ এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে শিবির কর্মীরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই তারা সরে পড়ে।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মগবাজারে হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এ সময় তারা দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় ও রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এদিকে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।
রাজধানীর আরমানিটোলায় নাশকতার অভিযোগে আটক দুই শিবিরকর্মীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার সকালে ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেট শিলু রায়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত এ শাস্তি দেয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন গোলাম আযম ও মো. আক্তারুজ্জামান।
মঙ্গলবার সকালে আরমানিটোলা এলাকায় ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে। পরে ঘটনাস্থলে এসে পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে এবং গাড়ি ভাংচুরের চেষ্টা করে। সেখান থেকে দু’জনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
হরতালে মাঠে আওয়ামী লীগ : জামায়াতের ডাকা হরতাল প্রতিরোধে রাজপথে তত্পর ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। হরতালবিরোধী মিছিল-সমাবেশ করেছে দলটি। মঙ্গলবার রাজধানীর শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, পল্টন ও প্রেস ক্লাব এলাকায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তত্পরতা দেখা গেছে। রাস্তার দু’পাশে এবং মোড়ে মোড়ে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে তাদের পাহারা দিতে দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে ছাত্রলীগ।
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মত্স্যজীবী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগসহ আরও একাধিক সংগঠন নিজস্ব ব্যানারে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে।
ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক শেখ রাসেল ও উপ-দফতর সম্পাদক তারেকের নেতৃত্বে শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মহড়া দিতে দেখা গেছে। সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। পরে সেখানে হরতালবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকার বাইরে কড়া হরতাল : জামায়াতের ডাকা দু’দিনের হরতাল সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। চট্টগ্রামে ঝটিকা মিছিল, ভাংচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। বরিশালে বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের মধ্য দিয়ে হরতাল পালিত হয়েছে। খুলনায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পিকেটাররা। রাজশাহীতে আগ্নিসংযোগ ও গাড়ি ভাংচুর করেছে জামায়াত-শিবিরি কর্মীরা। এসব ঘটনায় পুলিশ ৮ জনকে আটক করেছে। সিলেটে ঝটিকা মিছিল করে জামায়াত-শিবির। তাছাড়া সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে তারা। যশোরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে পিকেটাররা। প্রতিটি উপজেলায় হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
চট্টগ্রামে ঝটিকা মিছিল, ভাংচুর, বিস্ফোরণ : চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা ৩৬ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। নগরী থেকে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে টাউন সার্ভিস গাড়িও ছিল না। রিকশা ও সিএনজি চলাচল করলেও তার সংখ্যা ছিল একেবারেই কম। বড় বড় মার্কেট ও দোকানপাটগুলো বন্ধ ছিল। বন্দরের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হয়েছে। হরতালের প্রথম দিন গতকাল সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, গাড়ি ভাংচুর ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত ও শিবিরকর্মীরা। সকালে হালিশহর এবং কাজির দেউড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিটি গেটের বাইরে পিকেটাররা একটি প্রাইভেট কার ভাংচুর করে। দুপুরে হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরি মোড় থেকে ঝটিকা মিছিল বের করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। মিছিল থেকে রাস্তায় দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে এক শিবির কর্মীকে আটক করে। এছাড়া চকবাজার এলাকা, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকা, রাহাত্তারপুল, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, নতুন ব্রিজসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে হরতাল সমর্থক জামায়াত ও শিবির নেতাকর্মীরা।
বরিশালে বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর : হরতালে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন স্থানে টায়ারে অগ্নিসংযোগ, ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এছাড়া বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। দপদপিয়ায় ৬টি বাস, রাজাপুরে ১টি বিয়ের গাড়ি ও ২টি টেম্পো ভাংচুর করা হয়। গতকাল রাজাপুর থেকে ১, গৌরনদী থেকে ২ এবং আগের দিন বরিশাল থেকে ৩ জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গতকাল ভোররাত থেকেই জামায়াত-শিবির কর্মীরা নগরীর লাকুটিয়া সড়ক, গড়িয়ারপাড়, নবগ্রাম রোডসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, টায়ারে অগ্নিসংযোগ ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ভোর ৫টার দিকে নগরীর লাকুটিয়া টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সড়কে পেট্রল ঢেলে ও টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে। একই সময় নগরীর গড়িয়ারপাড় এলাকার বিক্ষোভ মিছিল থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করা হয়। রাত ৪টায় বরিশাল-ঝালকাঠির সীমান্ত এলাকা দপদপিয়ায় ৬টি বাস ভাংচুর করে হরতাল সমর্থকরা।
এদিকে গৌরনদীতে হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল বের করলে পুলিশ দুই জামায়াত নেতাকে গ্রেফতার করে। এরা হলেন উপজেলা জামায়াতের রোকন সদস্য মোস্তফা আনায়ারুল ইসলাম ওরফে টিপু চোকদার (৬০) ও জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন বেপারী (৩৫)। পুলিশ জানায়, গত সোমবার বাদ এশা ২০ থেকে ২৫ জন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী উপজেলার টরকী বন্দর বাসস্ট্যান্ডে হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল বের করে। খবর পেয়ে গৌরনদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় দু’জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অপরদিকে হরতাল সমর্থনকারীরা রাজাপুরে আল-মদিনা নামের একটি রিজার্ভ করা বিয়ের বাস ও দুটি ট্রলার টেম্পো ভাংচুর করে। উপজেলার নৈকাঠি বাজার এলাকায় সকালে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পিকেটাররা বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজাপুর উপজেলার নৈকাঠি বাজার এলাকায় রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে টায়ার জ্বালিয়ে আবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ জামায়াত কর্মী দাবি করে ওই বাজারের পাহারাদার নেছার আলীকে (৪০) গ্রেফতার করে। গতকাল বিকালে রাজাপুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হেমায়েত উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
খুলনায় ককটেল বিস্ফোরণ : ককটেল বিস্ফোরণ, বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিংয়ের মধ্য দিয়ে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল খুলনায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে খুলনার অফিস আদালত, ব্যাংক বীমার প্রধান দরজা বন্ধ ছিল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান, শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। সীমিত আকারে রিকশা-ভ্যান চললেও কোনো যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল করেনি। লঞ্চ ও ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়। এদিকে গত সোমবার নগরীর সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় মহানগরী ছাত্রশিবির হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ হামলা চালায়। এখান থেকে সাইফুল ইসলাম সাকি, রায়হান খান, মাসুদুর রহমান, বাবু ও আবুল হাসানকে গ্রেফতার করা হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, গতকাল সকালে মহানগরী শিবির নেতা ইমরান খালিদ ও হাদিসুর রহমানের নেতৃত্বে নগরীর গোয়ালখালি এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে ছাত্রশিবির কর্মীরা। অপরদিকে মহানগর শিবির নেতা ইমরান হুসাইন ও আবুবকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে সকালে নগরীর শিপইয়ার্ড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। এ সময় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে শিবির কর্মীরা। এছাড়া খুলনা উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ছাত্রশিবির খণ্ড খণ্ড মিছিল ও সমাবেশ করেছে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
রাজশাহীতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, আটক ৮ : গতকাল রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ছাত্রশিবির কর্মী সন্দেহে ৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটকদের নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি জিয়াউর রহমান জিয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে হরতাল চলকালে প্রথম দিন নগরীতে কোন বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পিকেটিং করেছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা।
এদিকে হরতাল শুরুর প্রথমেই ভোরে রাজশাহীর হরিয়ান বাইপাস সড়ক অবরোধ করে একটি ট্রাকে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। এর পরপরই সকালে নগরীর মতিহার থানার দেওয়ানপাড়া এলাকার শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল থেকে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
সকাল সোয়া ৭টার দিকে নগরীর শাহ মখদুম থানার নওদাপাড়া পোস্টাল অ্যাকাডেমির সামনের সড়কে হরতালের সমর্থনে মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা সড়কের ওপর টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করে।
এর কিছুক্ষণ পরে বায়া বিমানবন্দর সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা। একই সময় নগরীর পঞ্চবটি, সিটি বাইপাস, কাটাখালীসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে হরতাল সমর্থকরা পিকেটিংয়ের চেষ্টা চালায়। তবে পুলিশি বাধার কারণে বেশিক্ষণ সড়কে দাঁড়াতে পারেনি হরতাল সমর্থকরা।
এদিকে দুপুরে পুঠিয়ার বেলপুকুরে হরতাল সমর্থকরা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা ব্যাটারিচালিত দুটি অটোরিকশা ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই তারা চলে যায়। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হরতালের সমর্থনে পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
সিলেটে ঝটিকা মিছিল, সড়ক অবরোধের চেষ্টা : সিলেটে শান্তিপূর্ণভাবে জামায়াতের হরতাল পালিত হয়েছে। তবে হরতাল চলাকালে শহরতলির কুমারগাঁও তেমুখীতে কয়েকটি অটোরিকশা ভাংচুরের খবর জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া তত্পরতার মধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা চালায় হরতাল সমর্থকরা।
সকাল থেকে নগরীতে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করলেও ভারি যানচলাচল বন্ধ ছিল। হরতালের কারণে কদমতলী ও কুমারগাঁও বাস স্টেশন থেকে আঞ্চলিক রুটের কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে। নগরীর ব্যস্ততম এলাকার দোকানপাটও বন্ধ ছিল। সকালে মহানগর জামায়াত সুবিদবাজার এলাকায় মিছিল সমাবেশ করে। সকালে নগরীর শাহী ঈদগাহে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে ব্যানার টানিয়ে ঝটিকা মিছিলের পর সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। তবে পুলিশ আসায় তারা সরে যায়। পরে মোটরসাইকেল নিয়ে শিবির নেতাকর্মীরা রিকাবীবাজারে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। হরতালে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে মোটরসাইকেল দিয়ে গিয়ে হরতাল সমর্থকরা কুমারগাঁও পার্শ্ববর্তী তেমুখীতে একাধিক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাংচুর করে। হরতালের সমর্থনে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে সিলেট সদর উপজেলা জামায়াত। এদিকে হরতালের আগের রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিশ্বনাথ থেকে ৩ জন, কানাইঘাট থেকে ২ জন ও বালাগঞ্জ থেকে ২ জন শিবির কর্মীকে আটক করেছে।
যশোরে বিক্ষোভ অবরোধ : জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিন যশোরে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। হরতালে যানচলাচল ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। হরতালের কারণে যশোরে দূরপাল্লার ও অভ্যন্তরীণ রুটে যানচলাচল বন্ধ ছিল। দোকানপাট খোলেনি। অফিস আদালতে উপস্থিতি ছিল কম। হরতালে সকাল থেকে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে আসে। সকালে শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কে জামায়াতের উদ্যোগে একটি মিছিল বের হয়। এতে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাস্টার নূরুন নবী, শহর আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। এছাড়া দিনের বিভিন্ন সময় শহরে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে দলটি। সকালে বাঘারপাড়ার ধলগ্রাম রাস্তার মোড়, ছাতিয়ানতলা বাজার ও বাঘারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। তারা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের মনিরামপুর চালকিডাঙ্গা, বেগারিতলা, আটমাইলসহ কয়েকটি স্থানে রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে জামায়াত কর্মীরা। হরতাল চলাকালে যশোরের প্রতিটি উপজেলা সদরে মিছিল করেছে জামায়াত-শিবির।
শায়েস্তাগঞ্জে ২ নেতা গ্রেফতার : জামায়াতে ইসলামীর ডাকা দু’দিনের হরতালের প্রথমদিনই স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর আমির ও শিবিরের সভাপতিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতাররা হলেন, থানা জামায়াতের আমির প্রভাষক অলিউল্লাহ জহির ও শিবিরের সভাপতি নাজমুল ইসলাম। গতকাল সকালে পৌর এলাকার লেনজাপাড়া নামক স্থানে পিকেটিং করার সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের আটক করে।
বগুড়ায় স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত : বগুড়ায় বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যদিয়ে নজিরবিহীন পালিত হয়েছে হরতাল। জামায়াত-শিবির কর্মীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে দিনভর মিছিল ও পিকেটিং করেছে। বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও সকালে পিকেটারদের ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করেছে পুলিশ। এছাড়া শহরের কয়েকটি স্থানে বেশ কিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ও ৮-৯টি যানবাহন ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। সকালে জামায়াত-শিবির কর্মীরা শহরের খান্দার, গোহাইল রোড, পিটিআই মোড়, ঠনঠনিয়া, সাবগ্রাম, গোদারপাড়া চারমাথা, এরুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও পিকেটিং করে। এ সময় ৬-৭টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা। জামায়াত-শিবির কর্মীরা সকাল থেকেই বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের এরুলিয়ায় রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে। সকালে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সেখানে গেলে অবরোধকারীরা পালিয়ে যায়। এ সময় পিকেটারদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। তবে পুলিশ গুলি বর্ষণের কথা স্বীকার করেনি। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় কমপক্ষে ৪টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। সকাল আনুমানিক ৭টায় চারমাথা ঝোপগাড়ীতে একটি ট্রাকসহ ৩-৪টি গাড়ি ভাংচুর করে পিকেটাররা। বিকালে শহরের খান্দারে ৪-৫টি অটো টেম্পো ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা।
জয়পুরহাটে জামায়াত নেতা গ্রেফতার : জয়পুরহাটে হরতালে পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াতের আমির তছলিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে তার নিজ বাড়ি সদর উপজেলার পুরানা পৈলগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেফতার জামায়াত নেতা পাঁচবিবি থানায় হামলা, ভাংচুর, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষসহ একাধিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এবং হরতালে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে পুলিশ সন্দেহ করছে। তিনি হরতাল পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। অপরদিকে অবিলম্বে গ্রেফতার পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াতের আমির তছলিম উদ্দিনসহ সব নেতাদের মুক্তি দাবি করেছেন জেলা জামায়াত আমির ডা. ফজলুর রহমান সাঈদ ও পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারি প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান।
পিরোজপুরে হরতালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা : পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গাড়ি ভাংচুর, ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসী কর্তৃক দোকান ও বাসাবাড়িতে হামলার মধ্যদিয়ে পিরোজপুরে গতকাল জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথমদিন অতিবাহিত হয়েছে। জেলা জিয়ানগর উপজেলার বউডুবি এলাকায় হরতালে পিকেটাররা এক যুবলীগ কর্মীর মোটরসাইকেল ভাংচুর করলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ এক হয়ে হামলা চালিয়ে ওই এলাকার ৫টি দোকান ও ৪টি বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর করে।
এদিকে হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবির কর্মীরা পিরোজপুরের পাড়েরহাট, টগড়া মোড়, পত্তাশীবাজার, ইন্দুরকানী বাজার, চাড়াখালী চৌরাস্তা, কলেজ মোড়, গোডাউন সড়ক, চণ্ডিপুর ও বালিপাড়ায় পৃথক ঝটিকা মিছিল করে। টগড়া মোড়ে জামায়াত-শিবির কর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ ধাওয়া করে। তখন পুলিশকে লক্ষ্য করে শিবির কর্মীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশের লাঠিচার্জে দুই শিবিরকর্মী আহত হয়। এ সময় হরতাল সমর্থকরা টগড়া মোড়ে একটি রিকশা পুড়িয়ে দেয়।
চৌদ্দগ্রামে ভাংচুর অগ্নিসংযোগ : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গতকাল শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। এরআগে সোমবার রাতে পিকেটাররা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েকটি গাড়ির গ্লাস ভাংচুর শেষে একটি মালবাহী ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর থেকে পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়। হরতালের সমর্থনে মহাসড়কের মিয়াবাজার, দৌলবাড়ি, চৌদ্দগ্রাম বাজার ও আমজাদের বাজার এলাকায় মিছিল করে শিবিরকর্মীরা।
সিরাজগঞ্জে পুলিশ ভ্যানসহ ৫ যানবাহন ভাংচুর : হরতাল চলাকালে সিরাজগঞ্জে পুলিশের রিকুইজিশন করা একটি পিকআপ ভ্যান, একটি মোটরসাইকেল, একটি খাদ্যবাহী ট্রাক ও দুটি পিকআপ ভ্যান ভাংচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা। হরতাল শুরুর আগেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের নলকা, কাশেম মোড়, বানিয়াগাতী ও ঝাঐল ওভারব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিয়ে যানবাহনে হামলা চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধাওয়া করলে তারা মহাসড়ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ পাঁচ রাউন্ড টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পরে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়ক এলাকা থেকে উল্লাপাড়া উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকার শিবিরকর্মী মাহবুব হোসেন বাবলু আটক করে পুলিশ। এর আগে একই মহাসড়কের বালশাবাড়ী এলাকা থেকে উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতের আমির শাহজাহান আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রামগঞ্জে জামায়াত-শিবির ও যুবলীগের সংঘর্ষ : গতকাল দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার কেতুড়ী বাজারে জামায়াত-শিবির ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। রামগঞ্জ পৌরসভার জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ইমরান হোসেনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে যুবলীগ কর্মীরা। এ সময় জামায়াত নেতা ইমরান হোসেন, মাসুদ আলম, জামালউদ্দিন ও রাহানসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। আহতদের স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টা কেতুড়ী বাজারে জামায়াত-শিবির হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করলে যুবলীগ বাধা দেয়। এতে জামায়াত-শিবির ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরে যুবলীগের নেতাকর্মীরা কেতুড়ী বাজারে দুই তিনটি দোকান ভাংচুর ও রামগঞ্জ পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমরান হোসেনের বাড়ি, হাওলাদার বাড়ি, মোল্লা বাড়িসহ কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।
গাজীপুরে অগ্নিসংযোগ ভাংচুর, আটক ২ : গাজীপুরে জামায়াতের হরতালের প্রথমদিন গতকাল বিক্ষোভ মিছিল, পিকেটিং, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের টিয়ারসেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। হরতালের আগের রাত মহানগরের নলজানী এলাকার বাসা থেকে জামায়াতকর্মী আবদুল হাই ও গতকাল সকালে শিববাড়ি এলাকা থেকে ডুয়েটের ছাত্র মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে করা হয় বলে জামায়াতের গাজীপুর সদর উপজেলা আমীর হোসেন আলী জানান। তিনি আরও জানান, হরতাল সমর্থকরা দুপুরে মহানগরের টঙ্গী চেরাগআলী মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে পলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এ সময় হরতাল সমর্থকরা কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর ও ২টি সিএনজিতে অগ্নি সংযোগ করে।
জিয়ানগরে আ.লীগের হামলা ভাংচুর লুটপাট : হরতালে এক যুবলীগ কর্মীর মোটরসাইকেল ভাংচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার লক্ষ্মীদিয়া গ্রামের বিএনপি জামায়াত সমর্থক ৭ জনের বাড়ি এবং দোকানপাট ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে হরতালে শিবির পিকেটিংকালে জিয়ানগরের বৌডুবি এলাকায় যুবলীগ কর্মী কালামের মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ যুবলীগ নেতাকর্মীরা পাড়েরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা এনায়েত শিকদারের নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে সকাল ১১টায় বৌডুবি ও লক্ষ্মীদিয়া গ্রামে হামলা চালায়। হামলাকারীরা এ সময় দু’গ্রামে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ সময় মজিবর রহমান খান, হাফেজ আলাউদ্দিন, শাহাবুদ্দিন খান ও নাসির মুন্সীর বাড়ি ভাংচুর করে তারা। হামলাকারীরা নগদ প্রায় এক লাখ টাকা ও ৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।
গণগ্রেফতারের অভিযোগ জামায়াতের : হরতালে সারা দেশে গণগ্রেফতার চলছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। হরতাল চলাকালে গতকাল বিকালে এক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এ অভিযোগ করেন। সফলভাবে হরতাল পালন করায় তিনি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং চলমান আন্দোলন সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন ও গ্রেফতার অভিযান উপেক্ষা করে জনগণ আজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে ক্ষমতাসীন জুলুমবাজ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। দেশের জনগণ ক্ষমতাসীন জুলুমবাজ সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সরকারের জুলুম-নির্যাতনে দেশের জনগণ অতিষ্ঠ, বিক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।
তিনি বলেন, দিন যত যাচ্ছে সরকারের জুলুম-নির্যাতন ততই বাড়ছে। আজ হরতাল চলাকালে পুলিশ ও র্যাব গ্রেফতার অভিযান চালিয়ে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মো. তসলিম উদ্দিন ও সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো. শাহজাহানসহ সারা দেশে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। হরতালের সমর্থনে আয়োজিত মিছিলে আজ পুলিশ হামলা চালিয়ে শতাধিক নেতাকর্মীকে আহত এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত ৬ জনের প্রত্যেককে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে। লক্ষ্মীপুর শহর জামায়াতের সেক্রেটারি এমরান হোসেনের বাড়িসহ আটটি বাড়িতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। পুলিশ মাদারীপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইয়াদুল হককে পিটিয়ে আহত করেছে ও পটুয়াখালী জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট নাজমুল হককে গ্রেফতার করেছে। হরতাল আহ্বান ও পালন করা জনগণের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার পালনে বাধা দিয়ে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ ও গ্রেফতার করে সরকার নিজেই দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। সরকারের এ ধরনের ফ্যাসিবাদী তাণ্ডবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে গ্রেফতার সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান তিনি।
অস্তিত্ব রক্ষার এ হরতালে জামায়াত ইসলামী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পুলিশ-র্যাবও রাজপথ দখলে রেখেছে। র্যাব-পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলের ক্যাডাররাও রাজপথে রয়েছে। তারা বিভিন্ন স্থানে মহড়া দেয় এবং হরতালবিরোধী মিছিল করে। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া টহল হরতালে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কিছুক্ষণ পরপর জলকামান ও রায়ট কার নিয়ে পুলিশ এবং র্যাবের বিভিন্ন টিম বিভিন্ন পয়েন্টে হুইসল বাজিয়ে টহল দেয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে। কল্যাণপুর, যাত্রাবাড়ি, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে জামায়াত ও শিবির কর্মীরা। রাজধানীতে কিছু আন্তঃনগর বাস চললেও সংখ্যায় ছিল অন্য হরতালের চেয়ে অনেক কম। সরকারি অফিস খোলা থাকলেও উপস্থিতি ছিল খুবই কম। স্কুল-কলেজে ঈদের ছুটি এখনও শেষ হয়নি।
নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায় এবং জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার সরকারি পরিকল্পনার প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী ৩৬ ঘণ্টার হরতাল পালন করছে। প্রথমে ১২ ও ১৩ আগস্ট এ হরতালের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে ঈদ শেষে নির্বিঘ্নে যাত্রীদের ঢাকায় ফেরার কথা চিন্তা করে হরতাল একদিন পিছিয়ে ১৩ ও ১৪ আগস্ট করে দলটি। গতকাল এক বিবৃতিতে ৩৬ ঘণ্টার
এ হরতালের প্রথম দিন সফলভাবে জনগণ পালন করেছে বলে দাবি করেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। পুরো ৩৬ ঘণ্টার হরতাল সফল করতে দেশবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
হরতালের সমর্থনে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা। রাজধানীর কল্যাণপুরে সকাল পৌনে সাতটার দিকে ১০-১৫ জন শিবির-সমর্থক একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় তারা পাঁচটির মতো ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে তিনটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। গুলশানের শাহজাদপুরে ঝটিকা মিছিল ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় শিবির কর্মীরা।
সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সায়েদাবাদ ব্রিজ সংলগ্ন ইসলামিয়া জেনারেল হাসপাতালের সামনে ঝটিকা মিছিল করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রশিবির কর্মীরা। মিছিলটি সামনের দিকে এগিয়ে গেলে পুলিশ টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একই সময়ে লক্ষ্মীবাজার এলাকায় মিছিল করে কবি নজরুল সরকারি কলেজ শিবির কর্মীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন কলেজ শাখা শিবিরের সভাপতি সাইফুল ইসলাম শিহাব। এ সময় পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
সকাল পৌনে ৭টার দিকে কল্যাণপুর সোহরাব পেট্রোল পাম্পের সামনে থেকে মিছিল বের করে ছাত্রশিবির মহানগর (পশ্চিম) শাখার কর্মীরা। এ সময় তারা ৫-৬টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এছাড়া তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে দুই পথচারীসহ শিবিরের ঢাকা মহানগর পশ্চিমের সাংগঠনিক সম্পাদক মাঈন উদ্দিন ও অর্থ সম্পাদক বিপ্লব আহত হয়। তবে ঘটনাস্থল থেকে কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
সকাল ৭টার দিকে গুলশানের শাহজাদপুরেও ঝটিকা মিছিল ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। পরে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেলসহ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে ইসমাইল হোসেন বাবু নামে এক ফটোসাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়। শিবির সন্দেহে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সকাল ৮টার দিকে গেন্ডারিয়া ধুপখোলা মাঠ এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে শিবির কর্মীরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই তারা সরে পড়ে।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মগবাজারে হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এ সময় তারা দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় ও রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এদিকে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।
রাজধানীর আরমানিটোলায় নাশকতার অভিযোগে আটক দুই শিবিরকর্মীকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার সকালে ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেট শিলু রায়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত এ শাস্তি দেয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন গোলাম আযম ও মো. আক্তারুজ্জামান।
মঙ্গলবার সকালে আরমানিটোলা এলাকায় ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে। পরে ঘটনাস্থলে এসে পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় শিবিরের নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে এবং গাড়ি ভাংচুরের চেষ্টা করে। সেখান থেকে দু’জনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
হরতালে মাঠে আওয়ামী লীগ : জামায়াতের ডাকা হরতাল প্রতিরোধে রাজপথে তত্পর ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। হরতালবিরোধী মিছিল-সমাবেশ করেছে দলটি। মঙ্গলবার রাজধানীর শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, পল্টন ও প্রেস ক্লাব এলাকায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তত্পরতা দেখা গেছে। রাস্তার দু’পাশে এবং মোড়ে মোড়ে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে তাদের পাহারা দিতে দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে ছাত্রলীগ।
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মত্স্যজীবী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগসহ আরও একাধিক সংগঠন নিজস্ব ব্যানারে হরতালবিরোধী মিছিল করেছে।
ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক শেখ রাসেল ও উপ-দফতর সম্পাদক তারেকের নেতৃত্বে শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মহড়া দিতে দেখা গেছে। সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। পরে সেখানে হরতালবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকার বাইরে কড়া হরতাল : জামায়াতের ডাকা দু’দিনের হরতাল সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। চট্টগ্রামে ঝটিকা মিছিল, ভাংচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। বরিশালে বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের মধ্য দিয়ে হরতাল পালিত হয়েছে। খুলনায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পিকেটাররা। রাজশাহীতে আগ্নিসংযোগ ও গাড়ি ভাংচুর করেছে জামায়াত-শিবিরি কর্মীরা। এসব ঘটনায় পুলিশ ৮ জনকে আটক করেছে। সিলেটে ঝটিকা মিছিল করে জামায়াত-শিবির। তাছাড়া সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে তারা। যশোরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে পিকেটাররা। প্রতিটি উপজেলায় হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
চট্টগ্রামে ঝটিকা মিছিল, ভাংচুর, বিস্ফোরণ : চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা ৩৬ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। নগরী থেকে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে টাউন সার্ভিস গাড়িও ছিল না। রিকশা ও সিএনজি চলাচল করলেও তার সংখ্যা ছিল একেবারেই কম। বড় বড় মার্কেট ও দোকানপাটগুলো বন্ধ ছিল। বন্দরের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হয়েছে। হরতালের প্রথম দিন গতকাল সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, গাড়ি ভাংচুর ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত ও শিবিরকর্মীরা। সকালে হালিশহর এবং কাজির দেউড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিটি গেটের বাইরে পিকেটাররা একটি প্রাইভেট কার ভাংচুর করে। দুপুরে হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরি মোড় থেকে ঝটিকা মিছিল বের করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। মিছিল থেকে রাস্তায় দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে এক শিবির কর্মীকে আটক করে। এছাড়া চকবাজার এলাকা, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকা, রাহাত্তারপুল, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, নতুন ব্রিজসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে হরতাল সমর্থক জামায়াত ও শিবির নেতাকর্মীরা।
বরিশালে বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর : হরতালে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন স্থানে টায়ারে অগ্নিসংযোগ, ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এছাড়া বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। দপদপিয়ায় ৬টি বাস, রাজাপুরে ১টি বিয়ের গাড়ি ও ২টি টেম্পো ভাংচুর করা হয়। গতকাল রাজাপুর থেকে ১, গৌরনদী থেকে ২ এবং আগের দিন বরিশাল থেকে ৩ জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গতকাল ভোররাত থেকেই জামায়াত-শিবির কর্মীরা নগরীর লাকুটিয়া সড়ক, গড়িয়ারপাড়, নবগ্রাম রোডসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, টায়ারে অগ্নিসংযোগ ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। ভোর ৫টার দিকে নগরীর লাকুটিয়া টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সড়কে পেট্রল ঢেলে ও টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে। একই সময় নগরীর গড়িয়ারপাড় এলাকার বিক্ষোভ মিছিল থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করা হয়। রাত ৪টায় বরিশাল-ঝালকাঠির সীমান্ত এলাকা দপদপিয়ায় ৬টি বাস ভাংচুর করে হরতাল সমর্থকরা।
এদিকে গৌরনদীতে হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল বের করলে পুলিশ দুই জামায়াত নেতাকে গ্রেফতার করে। এরা হলেন উপজেলা জামায়াতের রোকন সদস্য মোস্তফা আনায়ারুল ইসলাম ওরফে টিপু চোকদার (৬০) ও জামায়াত নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন বেপারী (৩৫)। পুলিশ জানায়, গত সোমবার বাদ এশা ২০ থেকে ২৫ জন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী উপজেলার টরকী বন্দর বাসস্ট্যান্ডে হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল বের করে। খবর পেয়ে গৌরনদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় দু’জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অপরদিকে হরতাল সমর্থনকারীরা রাজাপুরে আল-মদিনা নামের একটি রিজার্ভ করা বিয়ের বাস ও দুটি ট্রলার টেম্পো ভাংচুর করে। উপজেলার নৈকাঠি বাজার এলাকায় সকালে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পিকেটাররা বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজাপুর উপজেলার নৈকাঠি বাজার এলাকায় রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে টায়ার জ্বালিয়ে আবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ জামায়াত কর্মী দাবি করে ওই বাজারের পাহারাদার নেছার আলীকে (৪০) গ্রেফতার করে। গতকাল বিকালে রাজাপুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হেমায়েত উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
খুলনায় ককটেল বিস্ফোরণ : ককটেল বিস্ফোরণ, বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিংয়ের মধ্য দিয়ে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল খুলনায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে খুলনার অফিস আদালত, ব্যাংক বীমার প্রধান দরজা বন্ধ ছিল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান, শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। সীমিত আকারে রিকশা-ভ্যান চললেও কোনো যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল করেনি। লঞ্চ ও ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়। এদিকে গত সোমবার নগরীর সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় মহানগরী ছাত্রশিবির হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ হামলা চালায়। এখান থেকে সাইফুল ইসলাম সাকি, রায়হান খান, মাসুদুর রহমান, বাবু ও আবুল হাসানকে গ্রেফতার করা হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, গতকাল সকালে মহানগরী শিবির নেতা ইমরান খালিদ ও হাদিসুর রহমানের নেতৃত্বে নগরীর গোয়ালখালি এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে ছাত্রশিবির কর্মীরা। অপরদিকে মহানগর শিবির নেতা ইমরান হুসাইন ও আবুবকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে সকালে নগরীর শিপইয়ার্ড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। এ সময় রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে শিবির কর্মীরা। এছাড়া খুলনা উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ছাত্রশিবির খণ্ড খণ্ড মিছিল ও সমাবেশ করেছে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
রাজশাহীতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, আটক ৮ : গতকাল রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ছাত্রশিবির কর্মী সন্দেহে ৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটকদের নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি জিয়াউর রহমান জিয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে হরতাল চলকালে প্রথম দিন নগরীতে কোন বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পিকেটিং করেছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা।
এদিকে হরতাল শুরুর প্রথমেই ভোরে রাজশাহীর হরিয়ান বাইপাস সড়ক অবরোধ করে একটি ট্রাকে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। এর পরপরই সকালে নগরীর মতিহার থানার দেওয়ানপাড়া এলাকার শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল থেকে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
সকাল সোয়া ৭টার দিকে নগরীর শাহ মখদুম থানার নওদাপাড়া পোস্টাল অ্যাকাডেমির সামনের সড়কে হরতালের সমর্থনে মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা সড়কের ওপর টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করে।
এর কিছুক্ষণ পরে বায়া বিমানবন্দর সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা। একই সময় নগরীর পঞ্চবটি, সিটি বাইপাস, কাটাখালীসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে হরতাল সমর্থকরা পিকেটিংয়ের চেষ্টা চালায়। তবে পুলিশি বাধার কারণে বেশিক্ষণ সড়কে দাঁড়াতে পারেনি হরতাল সমর্থকরা।
এদিকে দুপুরে পুঠিয়ার বেলপুকুরে হরতাল সমর্থকরা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা ব্যাটারিচালিত দুটি অটোরিকশা ভাংচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই তারা চলে যায়। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হরতালের সমর্থনে পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
সিলেটে ঝটিকা মিছিল, সড়ক অবরোধের চেষ্টা : সিলেটে শান্তিপূর্ণভাবে জামায়াতের হরতাল পালিত হয়েছে। তবে হরতাল চলাকালে শহরতলির কুমারগাঁও তেমুখীতে কয়েকটি অটোরিকশা ভাংচুরের খবর জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া তত্পরতার মধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা চালায় হরতাল সমর্থকরা।
সকাল থেকে নগরীতে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করলেও ভারি যানচলাচল বন্ধ ছিল। হরতালের কারণে কদমতলী ও কুমারগাঁও বাস স্টেশন থেকে আঞ্চলিক রুটের কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে। নগরীর ব্যস্ততম এলাকার দোকানপাটও বন্ধ ছিল। সকালে মহানগর জামায়াত সুবিদবাজার এলাকায় মিছিল সমাবেশ করে। সকালে নগরীর শাহী ঈদগাহে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা হরতালের সমর্থনে ব্যানার টানিয়ে ঝটিকা মিছিলের পর সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। তবে পুলিশ আসায় তারা সরে যায়। পরে মোটরসাইকেল নিয়ে শিবির নেতাকর্মীরা রিকাবীবাজারে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। হরতালে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে মোটরসাইকেল দিয়ে গিয়ে হরতাল সমর্থকরা কুমারগাঁও পার্শ্ববর্তী তেমুখীতে একাধিক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাংচুর করে। হরতালের সমর্থনে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে সিলেট সদর উপজেলা জামায়াত। এদিকে হরতালের আগের রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিশ্বনাথ থেকে ৩ জন, কানাইঘাট থেকে ২ জন ও বালাগঞ্জ থেকে ২ জন শিবির কর্মীকে আটক করেছে।
যশোরে বিক্ষোভ অবরোধ : জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিন যশোরে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। হরতালে যানচলাচল ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। হরতালের কারণে যশোরে দূরপাল্লার ও অভ্যন্তরীণ রুটে যানচলাচল বন্ধ ছিল। দোকানপাট খোলেনি। অফিস আদালতে উপস্থিতি ছিল কম। হরতালে সকাল থেকে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে আসে। সকালে শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কে জামায়াতের উদ্যোগে একটি মিছিল বের হয়। এতে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাস্টার নূরুন নবী, শহর আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। এছাড়া দিনের বিভিন্ন সময় শহরে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে দলটি। সকালে বাঘারপাড়ার ধলগ্রাম রাস্তার মোড়, ছাতিয়ানতলা বাজার ও বাঘারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয়। তারা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের মনিরামপুর চালকিডাঙ্গা, বেগারিতলা, আটমাইলসহ কয়েকটি স্থানে রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে জামায়াত কর্মীরা। হরতাল চলাকালে যশোরের প্রতিটি উপজেলা সদরে মিছিল করেছে জামায়াত-শিবির।
শায়েস্তাগঞ্জে ২ নেতা গ্রেফতার : জামায়াতে ইসলামীর ডাকা দু’দিনের হরতালের প্রথমদিনই স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর আমির ও শিবিরের সভাপতিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতাররা হলেন, থানা জামায়াতের আমির প্রভাষক অলিউল্লাহ জহির ও শিবিরের সভাপতি নাজমুল ইসলাম। গতকাল সকালে পৌর এলাকার লেনজাপাড়া নামক স্থানে পিকেটিং করার সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের আটক করে।
বগুড়ায় স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত : বগুড়ায় বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যদিয়ে নজিরবিহীন পালিত হয়েছে হরতাল। জামায়াত-শিবির কর্মীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে দিনভর মিছিল ও পিকেটিং করেছে। বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও সকালে পিকেটারদের ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করেছে পুলিশ। এছাড়া শহরের কয়েকটি স্থানে বেশ কিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ও ৮-৯টি যানবাহন ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। সকালে জামায়াত-শিবির কর্মীরা শহরের খান্দার, গোহাইল রোড, পিটিআই মোড়, ঠনঠনিয়া, সাবগ্রাম, গোদারপাড়া চারমাথা, এরুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও পিকেটিং করে। এ সময় ৬-৭টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা। জামায়াত-শিবির কর্মীরা সকাল থেকেই বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের এরুলিয়ায় রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে। সকালে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সেখানে গেলে অবরোধকারীরা পালিয়ে যায়। এ সময় পিকেটারদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। তবে পুলিশ গুলি বর্ষণের কথা স্বীকার করেনি। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় কমপক্ষে ৪টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। সকাল আনুমানিক ৭টায় চারমাথা ঝোপগাড়ীতে একটি ট্রাকসহ ৩-৪টি গাড়ি ভাংচুর করে পিকেটাররা। বিকালে শহরের খান্দারে ৪-৫টি অটো টেম্পো ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৩টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় পিকেটাররা।
জয়পুরহাটে জামায়াত নেতা গ্রেফতার : জয়পুরহাটে হরতালে পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াতের আমির তছলিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে তার নিজ বাড়ি সদর উপজেলার পুরানা পৈলগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেফতার জামায়াত নেতা পাঁচবিবি থানায় হামলা, ভাংচুর, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষসহ একাধিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এবং হরতালে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে পুলিশ সন্দেহ করছে। তিনি হরতাল পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। অপরদিকে অবিলম্বে গ্রেফতার পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াতের আমির তছলিম উদ্দিনসহ সব নেতাদের মুক্তি দাবি করেছেন জেলা জামায়াত আমির ডা. ফজলুর রহমান সাঈদ ও পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারি প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান।
পিরোজপুরে হরতালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা : পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গাড়ি ভাংচুর, ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসী কর্তৃক দোকান ও বাসাবাড়িতে হামলার মধ্যদিয়ে পিরোজপুরে গতকাল জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথমদিন অতিবাহিত হয়েছে। জেলা জিয়ানগর উপজেলার বউডুবি এলাকায় হরতালে পিকেটাররা এক যুবলীগ কর্মীর মোটরসাইকেল ভাংচুর করলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ এক হয়ে হামলা চালিয়ে ওই এলাকার ৫টি দোকান ও ৪টি বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর করে।
এদিকে হরতালের সমর্থনে জামায়াত-শিবির কর্মীরা পিরোজপুরের পাড়েরহাট, টগড়া মোড়, পত্তাশীবাজার, ইন্দুরকানী বাজার, চাড়াখালী চৌরাস্তা, কলেজ মোড়, গোডাউন সড়ক, চণ্ডিপুর ও বালিপাড়ায় পৃথক ঝটিকা মিছিল করে। টগড়া মোড়ে জামায়াত-শিবির কর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ ধাওয়া করে। তখন পুলিশকে লক্ষ্য করে শিবির কর্মীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশের লাঠিচার্জে দুই শিবিরকর্মী আহত হয়। এ সময় হরতাল সমর্থকরা টগড়া মোড়ে একটি রিকশা পুড়িয়ে দেয়।
চৌদ্দগ্রামে ভাংচুর অগ্নিসংযোগ : কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গতকাল শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। এরআগে সোমবার রাতে পিকেটাররা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েকটি গাড়ির গ্লাস ভাংচুর শেষে একটি মালবাহী ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে। এরপর থেকে পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়। হরতালের সমর্থনে মহাসড়কের মিয়াবাজার, দৌলবাড়ি, চৌদ্দগ্রাম বাজার ও আমজাদের বাজার এলাকায় মিছিল করে শিবিরকর্মীরা।
সিরাজগঞ্জে পুলিশ ভ্যানসহ ৫ যানবাহন ভাংচুর : হরতাল চলাকালে সিরাজগঞ্জে পুলিশের রিকুইজিশন করা একটি পিকআপ ভ্যান, একটি মোটরসাইকেল, একটি খাদ্যবাহী ট্রাক ও দুটি পিকআপ ভ্যান ভাংচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা। হরতাল শুরুর আগেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের নলকা, কাশেম মোড়, বানিয়াগাতী ও ঝাঐল ওভারব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিয়ে যানবাহনে হামলা চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধাওয়া করলে তারা মহাসড়ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ পাঁচ রাউন্ড টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পরে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়ক এলাকা থেকে উল্লাপাড়া উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকার শিবিরকর্মী মাহবুব হোসেন বাবলু আটক করে পুলিশ। এর আগে একই মহাসড়কের বালশাবাড়ী এলাকা থেকে উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতের আমির শাহজাহান আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রামগঞ্জে জামায়াত-শিবির ও যুবলীগের সংঘর্ষ : গতকাল দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার কেতুড়ী বাজারে জামায়াত-শিবির ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। রামগঞ্জ পৌরসভার জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ইমরান হোসেনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে যুবলীগ কর্মীরা। এ সময় জামায়াত নেতা ইমরান হোসেন, মাসুদ আলম, জামালউদ্দিন ও রাহানসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। আহতদের স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টা কেতুড়ী বাজারে জামায়াত-শিবির হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করলে যুবলীগ বাধা দেয়। এতে জামায়াত-শিবির ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরে যুবলীগের নেতাকর্মীরা কেতুড়ী বাজারে দুই তিনটি দোকান ভাংচুর ও রামগঞ্জ পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমরান হোসেনের বাড়ি, হাওলাদার বাড়ি, মোল্লা বাড়িসহ কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।
গাজীপুরে অগ্নিসংযোগ ভাংচুর, আটক ২ : গাজীপুরে জামায়াতের হরতালের প্রথমদিন গতকাল বিক্ষোভ মিছিল, পিকেটিং, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের টিয়ারসেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। হরতালের আগের রাত মহানগরের নলজানী এলাকার বাসা থেকে জামায়াতকর্মী আবদুল হাই ও গতকাল সকালে শিববাড়ি এলাকা থেকে ডুয়েটের ছাত্র মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে করা হয় বলে জামায়াতের গাজীপুর সদর উপজেলা আমীর হোসেন আলী জানান। তিনি আরও জানান, হরতাল সমর্থকরা দুপুরে মহানগরের টঙ্গী চেরাগআলী মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে পলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এ সময় হরতাল সমর্থকরা কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর ও ২টি সিএনজিতে অগ্নি সংযোগ করে।
জিয়ানগরে আ.লীগের হামলা ভাংচুর লুটপাট : হরতালে এক যুবলীগ কর্মীর মোটরসাইকেল ভাংচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার লক্ষ্মীদিয়া গ্রামের বিএনপি জামায়াত সমর্থক ৭ জনের বাড়ি এবং দোকানপাট ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে হরতালে শিবির পিকেটিংকালে জিয়ানগরের বৌডুবি এলাকায় যুবলীগ কর্মী কালামের মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ যুবলীগ নেতাকর্মীরা পাড়েরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা এনায়েত শিকদারের নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে সকাল ১১টায় বৌডুবি ও লক্ষ্মীদিয়া গ্রামে হামলা চালায়। হামলাকারীরা এ সময় দু’গ্রামে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ সময় মজিবর রহমান খান, হাফেজ আলাউদ্দিন, শাহাবুদ্দিন খান ও নাসির মুন্সীর বাড়ি ভাংচুর করে তারা। হামলাকারীরা নগদ প্রায় এক লাখ টাকা ও ৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়।
গণগ্রেফতারের অভিযোগ জামায়াতের : হরতালে সারা দেশে গণগ্রেফতার চলছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। হরতাল চলাকালে গতকাল বিকালে এক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এ অভিযোগ করেন। সফলভাবে হরতাল পালন করায় তিনি দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং চলমান আন্দোলন সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন ও গ্রেফতার অভিযান উপেক্ষা করে জনগণ আজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে ক্ষমতাসীন জুলুমবাজ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। দেশের জনগণ ক্ষমতাসীন জুলুমবাজ সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সরকারের জুলুম-নির্যাতনে দেশের জনগণ অতিষ্ঠ, বিক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।
তিনি বলেন, দিন যত যাচ্ছে সরকারের জুলুম-নির্যাতন ততই বাড়ছে। আজ হরতাল চলাকালে পুলিশ ও র্যাব গ্রেফতার অভিযান চালিয়ে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মো. তসলিম উদ্দিন ও সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো. শাহজাহানসহ সারা দেশে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। হরতালের সমর্থনে আয়োজিত মিছিলে আজ পুলিশ হামলা চালিয়ে শতাধিক নেতাকর্মীকে আহত এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত ৬ জনের প্রত্যেককে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে। লক্ষ্মীপুর শহর জামায়াতের সেক্রেটারি এমরান হোসেনের বাড়িসহ আটটি বাড়িতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। পুলিশ মাদারীপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইয়াদুল হককে পিটিয়ে আহত করেছে ও পটুয়াখালী জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট নাজমুল হককে গ্রেফতার করেছে। হরতাল আহ্বান ও পালন করা জনগণের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার পালনে বাধা দিয়ে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ ও গ্রেফতার করে সরকার নিজেই দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। সরকারের এ ধরনের ফ্যাসিবাদী তাণ্ডবের তীব্র নিন্দা জানিয়ে গ্রেফতার সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান তিনি।
0 comments:
Post a Comment