সেনাবাহিনী রাজধানী কায়রোর দুটি স্কয়ারে সমবেত আন্দোলনকারীদের ঘিরে রেখে বিক্ষোভ কর্মসূচি বন্ধ করে তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মুরসির সমর্থকদের বিক্ষোভ দমনের জন্য বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করা, অবস্থান ধর্মঘটকারীদের জন্য খাদ্য ও পানি সরবরাহে বাধা দেয়া, আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা, দুই স্কয়ারে আসা-যাওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেয়াসহ আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সেনাবাহিনী।
মিসরে সেনা সমর্থিত সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেছেন, তারা তাদের প্রতিবাদ বিক্ষোভ আল তাহরির স্কয়ারে স্থানান্তর করবেন। তারা আরও বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে মুক্ত করে তাকে ক্ষমতা ফিরিয়ে না দেয়া পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।
মিসরের ঘটনাবলি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দেশটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত অতিক্রম করছে। সেনাবাহিনী ও মুরসির সমর্থকদের মুখোমুখি ও আপসহীন অবস্থান নিঃসন্দেহে মিসরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। মিসরের কোনো কোনো কর্মকর্তা সেদেশে যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ রক্তাক্ত সংঘাতের আশঙ্কা করছেন।
বর্তমানে মিসরের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো অর্থাত্ মুসলিম ব্রাদারহুড, সেনাবাহিনী অথবা মুরসিবিরোধী লিবারেল দলগুলো সবাই নিজ নিজ অবস্থানে অটল থেকে সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছে’ যার পরিণতি কখনোই ভালো হবে না। মিসরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ মিসরে বিরাজমান পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।
বর্তমানে মিসরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা ও জান-মালের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা বেড়ে চলেছে। যদিও কে কারা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতি করছে তা স্পষ্ট নয়; কিন্তু বর্তমান গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে উগ্র সালাফিরা এর সুযোগ নিচ্ছে। তাই এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মুরসির বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের পর শুধু যে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাই নয়, একই সঙ্গে সামাজিক সঙ্কটও চরম আকার ধারণ করেছে।
মিসরের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কট দেখা দেয়া ছাড়াও দেশটির অর্থনীতিও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশটির ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ অবস্থায় মিসরের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজে বের করা সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু তাই বলে এটা ভাবা উচিত হবে না যে, সামরিক অভিযান চালিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান করা যাবে বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। অন্যদিকে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকদের অবস্থান কর্মসূচি ঈদের পর ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার নামে সেনা সমর্থিত সরকারের নতুন ক্র্যাকডাউনের হুমকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন মিসরের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মিসরে বর্তমানে যে বিপজ্জনক রাজনৈতিক অচলাবস্থা বিরাজ করছে এতে করে দেশটিতে মারাত্মক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
শুক্রবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল মিসরের সেনা মদতপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারকে মিসরে দ্রুত একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং সব পক্ষকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি মুরসিকে মুক্তি দেয়ারও আহ্বান জানান।
এছাড়া তুর্কি প্রেসিডেন্ট সব পক্ষকেই সংযত আচরণ করার ও সংঘাত এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। ওই নিবন্ধে তিনি বলেন, মিসরের জনগণ স্পষ্ট দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে বিপজ্জনকভাবে চালিত হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মারাত্মক উদ্বেগের।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, মিসরের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সিনেটর জন ম্যাককেইন বলেন, তিনি এবং সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সম্প্রতি কায়রো সফরকালে জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসিকে যে ক’টি পরামর্শ দিয়েছেন তার একটিও কানে তোলেননি সিসি। এর মধ্যে একটি পরামর্শ ছিল গত ৩ জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর আটক কয়েকজন মুসলিম ব্রাদারহুড নেতাকে মুক্তি দেয়া। ম্যাককেইন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আল-সিসি ব্রাদারহুডের সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপেই বসতে প্রস্তুত নন। অন্যদিকে ব্রাদারহুডও সহিংসতা এড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নয়। সংলাপ শুরু না হলে বর্তমান অচলাবস্থা অচিরেই একটা মারাত্মক সংঘাতে রূপ নেবে।
এদিকে মিসরে আগাম নির্বাচনের বিরোধিতা করেছে মুসলিম ব্রাদার ইউনিয়ন। একই সঙ্গে তারা দেশে চলমান সঙ্কট সমাধানে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড মুফতির মধ্যস্থতারও বিরোধিতা করেছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির সমর্থকরা আল আজহারের তত্ত্বাবধানে যে কোনো আলোচনা বা শান্তি পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেছে, আল আজহারের মুফতি আহমদ আল তাইয়্যেব মিসরে সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড মুফতি আহমদ আল তাইয়্যেব সেনা সমর্থিত সরকারের বিরোধী জোটকে চলতি সপ্তাহে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানানোর পর ইখওয়ানুল মুসলিমিন আগাম নির্বাচন এবং বিরাজমান সমস্যা সমাধানে আল আজহারের মধ্যস্থতার বিরোধিতা করে।
0 comments:
Post a Comment