প্রাইভেট কারে এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় একাধিক ভুক্তভোগী প্রথম আলো ডটকমের কাছে তাঁদের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। ভবিষ্যত্ হয়রানি এড়াতে তাঁরা নাম প্রকাশও করতে চান না। তবে পুলিশ কিংবা র্যাবের কাছে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনার কোনো রেকর্ড নেই।
গত জুলাই মাসের ঘটনা। জুলাইয়ের ১৮ তারিখ। হরতাল চলছিল দেড়জুড়ে। একেবারে ভরদুপুর, ঘড়ির কাঁটায় বেলা একটা। ফয়সল আহমেদ (ছদ্মনাম) ব্যবসার কাজে উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বনানী যাবেন। হঠাত্ একটি সাদা রঙের পুরোনো স্টেশন ওয়াগন এসে দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য ডাক দিতে থাকে। দুজন পেছনের সিটে বসা আর সামনে চালকের পাশে আরও এক যাত্রী থাকায় প্রাইভেট কারের পেছনে ডান পাশের আসনে বসেন ফয়সল।
চারজনের বয়সই ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বিমানবন্দর পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রাইভেট কারের সামনের আসনের যাত্রীবেশী ব্যক্তিটি পেছন ফিরে পিস্তল তাক করেন ফয়সলের দিকে। কিছুক্ষণ পর ওই যুবক পিস্তলটি দেন পেছনের আসনে বসে থাকা আরেক যুবকের হাতে। এর মধ্যে বনানী ঘুরে প্রাইভেট কারটি আবারও উত্তরার দিকে যেতে থাকে। একই সঙ্গে ফয়সলের কাছে কী কী আছে জিজ্ঞেস করতে থাকেন ওই যুবকেরা। প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ, নগদ ৩০ হাজার টাকা, স্যামসং গ্যালাক্সি মোবাইল ফোনসেটটি ফয়সল তুলে দেন এক ছিনতাইকারীর হাতে।
এতেও ছিনতাইকারীরা দমেনি। ফয়সলের কাছ থেকে দুটি ক্রেডিট কার্ড ছিনিয়ে
নেয় তারা। এ সময় ক্রেডিট কার্ডগুলো সচল না অচল যাচাই করতে ফয়সলের ওপর
মারধরও চলতে থাকে। খানিক পর মোটরসাইকেলে করে আরও এক যুবক বিশ্ব রোড মোড়ে
প্রাইভেট কারটির কাছে এসে ক্রেডিট কার্ডগুলো নিয়ে যান। এ সময় আরও
কয়েকবার ফয়সলকে নিয়ে উত্তরা থেকে বনানী পর্যন্ত অবিরাম ঘুরতে থাকে
প্রাইভেট কারটি। উত্তরা এলাকার দুটি বুথ থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে
মোটরসাইকেলের ওই যুবক ফোন করলে ফয়সলকে বেলা দুইটার দিকে বলাকা বিমান
কার্যালয়ের পাশে নামিয়ে দেওয়া হয়।
ওই দিন বিকেলে খিলক্ষেত থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান ফয়সল।
কিন্তু থানায় কর্তব্যরত কর্মকর্তার গালমন্দ উল্টো হজম করতে হয় ফয়সলকে।
উপপরিদর্শক পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা গালমন্দ করে ফয়সলকে বলেন, ‘কেন
প্রাইভেট কারে চড়লেন? খিলক্ষেতে নয়, উত্তরা থানায় গিয়ে মামলা করেন।
জিডি নেওয়া যাবে না।’
পুলিশের এসব বক্তব্য শুনে পরে মামলা বা জিডি কোনো কিছুই না করার
সিদ্ধান্ত নেন ফয়সল। তিনি বলেন, ‘মামলা করলে না জানি কী ঝামেলায় পড়তে
হয়। তাই ঠিক করেছি, কিছুই করব না।’
একইভাবে এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাতটায় বিমানবন্দর সড়কে
বারিধারা ডিওএইচএসের সামনে প্রাইভেট কারে উঠে দেড় লাখ টাকা হারিয়েছেন এক
ব্যাংক কর্মকর্তা। মিরপুরের বাসায় যাওয়ার সময় ৩০ বছর বয়সী ওই ব্যাংক
কর্মকর্তাকে র্যাডিসন হোটেলের একটু আগে, বারিধারা বাসস্ট্যান্ডের সামনে
থেকে অস্ত্রের মুখে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেন পাঁচ যুবক। গাড়িতে
নিয়ে তাঁকে হাত-পা বেঁধে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। ক্রেডিট কার্ডের পিন
নম্বর ওই ব্যক্তি ভুলে গেলে বাসায় ফোন করানো হয়। পিন নম্বর জানার পর টাকা
তুলে রাত সাড়ে ১২টার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় আশুলিয়া এলাকার একটি
নির্জন স্থানে তাঁকে মাইক্রোবাস থেকে ফেলে দেয় ছিনতাইকারীরা। ওই ঘটনার
বর্ণনা দেওয়ার সময় বারবার শিউরে উঠছিলেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য: এসব ঘটনার সারসংক্ষেপ
শোনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান)
আবদুল জলিল মণ্ডল গত রোববার প্রথম আলো ডটকমকে জানান, এ ধরনের ছিনতাই ঢাকা
শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে ঘটছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উপকমিশনারদের
তত্ত্বাবধানে একাধিক দল কাজ করছে। অনেকে ধরাও পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘টাকা
বাঁচানোর জন্য এ ধরনের প্রাইভেট কারে চড়া উচিত নয়। তবে থানা মামলা না
নিলে ওই এলাকার উপকমিশনারের (ডিসি) কাছে অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া
হবে। এ ধরনের নির্দেশ আমরা দিয়েছি।’
তবে প্রাইভেট কারের ভেতর সর্বস্ব হারানোর ঘটনায় গত তিন মাসে মামলার কোনো তথ্য ডিএমপির তথ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যাঁদের কাছে
টাকা থাকে, ক্রেডিট কার্ড থাকে, তাঁরা কেন ঝুঁকি নিয়ে এ ধরনের প্রাইভেট
কারে ওঠেন?
র্যাবের ভাষ্য: নিজেদের
গোয়েন্দাদের মাধ্যমে এ ধরনের ছিনতাইকারীদের দমন করা হয়ে থাকে বলে জানান
র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এ টি এম হাবিবুর রহমান। গতকাল সোমবার নিজ
কার্যালয়ে প্রথম আলো ডটকমকে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ এলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা
নিই।’ গত জুন মাসে র্যাডিসন হোটেলের নারীকর্মী আলেয়া ফেরদৌসীকে একইভাবে
ছিনতাইকারীরা হত্যা করেছিল। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে ধরার
জন্য র্যাব অভিযান চালালে তারা মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে র্যাবের ওপর গুলি
চালায়।তখন র্যাব পাল্টা গুলি চালালে দুজন ছিনতাইকারী নিহত হয়।
0 comments:
Post a Comment