ভারতের লিলিপুট কিডসওয়্যারের কাছ থেকে রপ্তানির
অর্থ না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেবে
না ১০টি কারখানা প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি জানিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে তৈরি
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছে।
এদিকে দুই বছর আগের এই লিলিপুটের ঘটনা নিয়ে শ্রমিকদের
বঞ্চিত করতে মালিকদের এই পাঁয়তারা নিয়ে বিজিএমইএ ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা
ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, শ্রমিকদের সঙ্গে লিলিপুটের ঘটনার কোনো
সম্পৃক্ততা নেই।
জানা যায়, বাংলাদেশের ২২টি তৈরি পোশাক কারখানা থেকে ২০১১
সালের সেপ্টেম্বরে ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করে লিলিপুট
কিডসওয়্যার লিমিটেড। তবে বিভিন্ন অজুহাতে গত দুই বছরেও পাওনা পরিশোধ করেনি
লিলিপুট কর্তৃপক্ষ।
ক্ষতিগ্রস্ত মালিকেরা বলছেন, লিলিপুটে পোশাক সরবরাহকারী
কারখানার মালিকেরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে টাকা
আটকা থাকায় প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ব্যাংক সুদ দিতে হছে। তাঁদের দাবি,
ঋণের বোঝা টানতে টানতে ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। নিরুপায় হয়েই
তাঁরা বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছে।
অনুপম ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড থেকে লিলিপুট ছয় লাখ ৭৬
হাজার ডলারের পণ্য নেয়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. মামুন ইসলাম খান
জানান, ঈদের আগে বেতন-ভাতার অপারগতার কথা জানিয়ে গত রোববার ও সোমবার ১০টি
প্রতিষ্ঠান পৃথকভাবে বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে—অনুপম ফ্যাশন, মাসকান জিনস, বরাত
সোয়েটার, জেমিনি গার্মেন্টস, এ প্লাস সোয়েটার, পানটি নিট, কেন্ট
গার্মেন্টস, হাইপয়েট সোয়েটার, উত্তরণ গার্মেন্টস, নিউ জেনারেশন ও অন্বেষা
গার্মেন্টস। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই ধরনের চিঠি দেওয়ার কথা চিন্তা
করছে বলেও জানান মামুন। প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত ১৫ হাজার শ্রমিক কাজ
করেন।
জেমিনি গার্মেন্টেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান
তাঁর চিঠিতে বলেছেন, ‘সরকার ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ৭ আগস্টের
(প্রকৃতপক্ষে ৬ আগস্ট) মধ্যে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু লিলিপুট দুই
বছর ধরে তার তিন লাখ চার হাজার ডলার পরিশোধ করছে না। এ কারণে আমরা
আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে আছি। ব্যাংক সাহায্য করছে না।’ বিজিএমইএ
কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা মালিকদের ওই চিঠি পাওয়ার কথা গতকাল মঙ্গলবার
এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন।
গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশনের সভাপতি মোশরেফা মিশু
বলেন, মালিকেরা শ্রমিকদের কখনোই লাভের গল্প শোনান না কিংবা কোনো ভাগ দেন
না। তবে লোকসান হলেই ঠকানোর চেষ্টা করেন। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়
না। এটা করে মালিকেরা আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লিলিপুটের
কার্যাদেশ পাওয়ার পর ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খুলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ
নিয়ে পোশাক তৈরি শুরু করে প্রতিষ্ঠানগুলো। তারপর পোশাক প্রস্তুত হয়ে
গেলে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বেনাপোল দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জাহাজীকরণের (পণ্য পাঠানোর) সর্বশেষ তারিখ মানতে
পারেনি।
জানা যায়, বন্দরে পৌঁছালে সময়মতো পণ্য খালাস করে নেয়
লিলিপুট। তবে কারখানা মালিকদের টাকা পরিশোধ নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। এ
বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে গত বছরের জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে ডিপার্টমেন্ট অব
কমার্সে (ডিওসি) উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী,
লিলিপুটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্জীব নেরুলা গত জানুয়ারি পর্যন্ত ছয়
কিস্তিতে অর্থ পরিশোধে সম্মত হন।
তবে সঞ্জীব নেরুলা কথা রাখেননি। কোনো কিস্তি পরিশোধ করেননি। এরপর বিজিএমইএ ও সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করেও কোনো ফল হয়নি।
শ্রমিকেরা কেন লোকসানের দায়ভার নেবে—এমন প্রশ্ন করলে
মামুন ইসলাম খান ও ফজলুর রহমান স্বীকার করেন যে শ্রমিকদের কোনো দোষ নেই।
তাঁদের অভিযোগ, সরকার সব পক্ষই লিলিপুটের ঘটনা জানে। কিন্তু জোরালো উদ্যোগ
না নেওয়ায় টাকা আদায় হচ্ছে না।
বিজিএমইএর সহসভাপতি এস এম মান্নান গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, কারখানা খোলা আছে। শ্রমিকেরা কাজ করেছে। বিজিএমইএকে চিঠি দিয়ে কোনো লাভ নেই। মালিকদের অবশ্যই টাকা দিতে হবে। এটাই শেষ কথা।
0 comments:
Post a Comment